বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬

আইনস্টাইনের বিখ্যাত সমীকরণ E=mc2 এর মানে কি?

‎জার্মান পদার্থবিদ আলবার্ট আইনস্টাইনের বিখ্যাত সমীকরণ E=mc2 এর মানে কি?

‎



‎যদি প্রশ্ন করা হয়, বিজ্ঞানের তথা পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে নামকরা সমীকরণ কোনটি? নিঃসন্দেহে বলা যায়, সবাই চোখ বন্ধ করে বলবেন, E=mc2। যাঁরা বিজ্ঞানের তেমন খোঁজখবর রাখেন না, তাঁদের কাছেও সমীকরণটি পরিচিত। সিংহভাগ মানুষের কাছে বিজ্ঞানের অধিকাংশ সমীকরণ মিসরের হায়ারোগ্লিফিকসের মতো দুর্বোধ্য।

‎

‎সেখানে এই সমীকরণ অনেকের কাছেই যেন সুপরিচিত ব্র্যান্ডের লোগো। সহজে মনে রাখার মতো। এই সমীকরণের কাঁধে চেপে একসময় পরমাণুর হৃদয় খুঁড়ে কোয়ান্টাম পদার্থবিদেরা বের করে আনেন বিপুল পরিমাণ শক্তি। সেই শক্তির দাপটে ১৯৪৫ সালে তছনছ হয়ে গিয়েছিল জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহর।

‎

‎পদার্থবিজ্ঞানের সমীকরণগুলো আসলে নিছক বীজগণিতের আঁকিবুঁকি নয়, বরং সেগুলো কোনো না কোনো ভৌত জগৎ ব্যাখ্যা বা বর্ণনা করে। সাধারণ মানুষের মনের গভীরে এই সমীকরণ গেঁথে যাওয়ার এটিও একটি কারণ। আবার এই সমীকরণ যে ভৌত ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করে, সেটিও সহজ ও বোধগম্য। এখানে সমীকরণের E অর্থ এনার্জি বা শক্তি, m-এর অর্থ মাস বা ভর এবং c-এর অর্থ শূন্যস্থানে আলোর বেগ—যার পরিমাণ সেকেন্ডে ২৯,৯৭,৯২,৪৫৮ মিটার। এটি বলে, শক্তি হলো ভর আর আলোর বেগের বর্গের গুণফলের সমান।

‎

‎সমীকরণটি ইঙ্গিত করে যে সেগুলো একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু এটুকুই কি সব? এর আসল অর্থ কী? ভর, শক্তি ও আলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হয় কীভাবে? আর তাদের মধ্যকার এই সম্পর্ক আমাদের নিজেদের এবং মহাবিশ্বের মৌলিক প্রকৃতি সম্পর্কে কী অর্থ প্রকাশ করে?

‎

‎আমাদের অধিকাংশেরই ধারণা, ভর হলো সেই বস্তু, যা দিয়ে আমরা বা আমাদের দেহ গঠিত হয়েছে। স্কুলের বিজ্ঞান বইয়েও পড়ানো হয় যে কোনো কিছু পদার্থ হওয়ার অন্যতম শর্ত তার ভর থাকা। ভর নেই মানে, সেটা অপদার্থ!

‎

‎E=mc2 সমীকরণে E অর্থ এনার্জি বা শক্তি, m-এর অর্থ মাস বা ভর এবং c-এর অর্থ শূন্যস্থানে আলোর বেগ। এটি বলে, শক্তি হলো ভর আর আলোর বেগের বর্গের গুণফলের সমান।

‎

‎সেই হিসাবে কাউকে অপমান-অপদস্থ করতে আর অপদার্থ বলার উপায় নেই। ভর বলতেই আমরা বুঝি, সেটি ভারী, তাগড়াই। অন্যদিকে কম ভরের কিছু মানে সেটি হালকা-পাতলা, বায়বীয়। নিউটন বলেছিলেন, বস্তুর ত্বরণে যা বাধা দেয়, সেটিই হলো ভর।

‎

‎একেবারে ছোটবেলা থেকেই এ রকম ধারণা আমাদের মনের মধ্যে গেঁথে যেতে থাকে। সেটিই ধরা পড়েছে নিউটনের গতির সূত্রে: F=ma। কয়েক শতাব্দী ধরে সমীকরণটি পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে রেখেছিল। এখানে F হলো বস্তুতে প্রয়োগকৃত বল, m মানে ভর এবং a হলো ত্বরণ। সূত্রটি থেকে জানা যায়, কোনো বস্তুর ভর অনেক বেশি হলে, তা নাড়াতে অনেক বেশি বল প্রয়োগ করতে হবে। আর ভর কম হলে, তা নাড়ানো যাবে সামান্য ধাক্কাতেই।

‎

‎সাধারণ হিসাবে, ভর হলো বস্তুর মোট পরিমাণ। বেশি ভরের বস্তু, যেমন পাহাড় বা কোনো গ্রহ বেশি দৃঢ় বা কঠিন বলে মনে হয়। অন্যদিকে শক্তিকে ভাবা হয় ভরের চেয়ে একেবারেই আলাদা কিছু। শক্তিকে বরং তাপ, আলো, আগুন বা গতির সঙ্গে মেলাতে আমরা বেশি পছন্দ করি। আবার একে কোনো ক্ষণস্থায়ী কিছু ভাবা হয়, যা প্রবাহিত হয় বা যাকে স্থানান্তরিত করা যায়। এটি আমাদের কোনো কাজ করার বা কিছু পুড়িয়ে ফেলার ক্ষমতা দেয়। জাদুকরি কোনো কিছুর মতো একে জমিয়ে রাখা যায় এবং প্রয়োজনমতো বের করে দেওয়া যায়।


‎ভর হলো বস্তুর মোট পরিমাণ। বেশি ভরের বস্তু, যেমন পাহাড় বা কোনো গ্রহ বেশি দৃঢ় বা কঠিন বলে মনে হয়। অন্যদিকে শক্তিকে ভাবা হয় ভরের চেয়ে একেবারেই আলাদা কিছু।

‎দীর্ঘদিন ধরে ভর ও শক্তি–সম্পর্কিত আমাদের এই সহজাত ভাবনা নিউটনের সূত্রের সঙ্গে বেশ মানানসই ছিল। এমনকি মহাবিশ্বকে আমরা একসময় যেমন ধারণা করতাম, তার সঙ্গেও মিল ছিল সেই ভাবনার।

‎

‎আমরা ভাবতাম, ভর ও শক্তি পরস্পরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করলেও এ দুটি পুরোপুরি ভিন্ন। যেমন আমাদের ধারণা, কোনো কাপে কিছু পানি যোগ করলে তার ভর বাড়ে। কিন্তু সেখানে শক্তি যোগ করলে, ভর বাড়বে না, শুধু কাপের পানির অণুগুলোর গতি বাড়বে। মোটকথা, তাপ বাড়ালে কাপে অণুর পরিমাণ বাড়ে না, শুধু অণুগুলোতে আলোড়ন তুলবে।

‎

‎১৮৮০–এর দশকে পদার্থবিদেরা প্রশ্ন তুলতে লাগলেন, ভর কোথা থেকে আসে? এটি আসলে কী? জবাবে অনেকে ভাবলেন, কোনো বস্তুর ভরের জন্য দায়ী আসলে ইলেকট্রন। কারণ, তখন সবে ইলেকট্রন আবিষ্কার করেছেন পদার্থবিদ জে জে টমসন। তাই তাঁর ঘাড়ে ভরের দোষ চাপাতে চেষ্টা করলেন বিজ্ঞানীরা।

‎

‎পদার্থবিদেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে পান, ইলেকট্রনের মতো কোনো চার্জিত কণা যখন চলাফেরা করে, তখন তা একটি চৌম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরি করে। চৌম্বকীয় ক্ষেত্রটি কণার পেছনে ধাক্কা দেয়, যার কারণে কণাটির পক্ষে দ্রুত বেগে চলা কঠিন হয়ে ওঠে। ঘটনাটির এই প্রভাবের সঙ্গে আরেক বিষয়ের মিল খুঁজে পান বিজ্ঞানীরা। ধাক্কা দিয়ে নাড়ানো কঠিন কোনো পদার্থের যেমন ভর থাকে, ইলেকট্রনের প্রভাবও অনেকটা সে রকম। এখান থেকেই পদার্থবিদেরা প্রথম ধারণা পান যে ভর ও শক্তি (চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের শক্তি) স্রেফ আলাদা বিষয় নয়, বরং অন্য কিছুও হতে পারে। কিন্তু সেই অন্য কিছুটা কী?


‎

‎ইলেকট্রনের মতো কোনো চার্জিত কণা যখন চলাফেরা করে, তখন তা একটি চৌম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরি করে। চৌম্বকীয় ক্ষেত্রটি কণার পেছনে ধাক্কা দেয়, যার কারণে কণাটির পক্ষে দ্রুত বেগে চলা কঠিন হয়ে ওঠে।

‎

‎২

‎১৯০৫ সালে ঠিক এই সময়ে একটি চমৎকার যুক্তি নিয়ে ময়দানে হাজির হন আলবার্ট আইনস্টাইন। তাতে পদার্থবিজ্ঞানের এই বিতর্কের অবসান হয়। সে সময় আপেক্ষিকতার তাত্ত্বিক ধারণা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন এই জার্মান বিজ্ঞানী। পরস্পরের সাপেক্ষে চলমান বস্তুগুলোর ওপর পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মকানুন কী হবে, সেটিই ছিল আপেক্ষিক তত্ত্বের সারকথা। তখনই প্রথম জানা গেল, আলোর চেয়ে বেশি বেগে কিছুই চলতে পারে না। কোনো ব্যক্তি বা কোনো কিছু কতটা জোরে ছুটছে, তার ওপর আলোর এই বেগ নির্ভর করে না।

‎

‎আমাদের সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানে মনে হয়, টর্চলাইট হাতে নিয়ে দৌড়ালে আলোর বেগ বাড়বে (অর্থাৎ আলোর মোট বেগ = আপনার দৌড়ানোর বেগ + আলোর বেগ)। কিন্তু আইনস্টাইন বললেন, এ ধারণা ভুল। খুব জোরে ছুটলেও দেখা যাবে, আলো একই গতিতে চলছে। এটিই মহাজাগতিক গতিসীমা। এই মৌলিক সীমার কারণে পৃথিবীতে স্থির থাকা এবং রকেটে চেপে অতিদ্রুত চলা দুই ব্যক্তির মধ্যে কিছু অদ্ভুত প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়।

‎

‎বিষয়টি বোঝাতে মহাকাশে কোনো পাথর থেকে তাপ নিঃসরণের উদাহরণ টেনেছেন আইনস্টাইন। পাথর থেকে তাপ বেরিয়ে আসবে অবলোহিত আলো রূপে। মানে, ইনফ্রারেড ফোটন। আপনি যদি ওই পাথরের পাশে মহাকাশে ভাসেন, তাহলে সেখানে কিছুই অদ্ভুত বলে মনে হবে না। কিন্তু পাথর থেকে ইনফ্রারেড ফোটন বেরিয়ে আসতে দেখা গেলে এবং তা মাপা হলে দেখা যেত, ওই ফোটনের শক্তি নির্দিষ্ট (আসলে সব ফোটনের শক্তিও নির্দিষ্টই থাকে)।

‎

‎কিন্তু আপনি যদি পৃথিবীর পাশ দিয়ে দ্রুতগামী কোনো রকেটে থাকেন, তাহলে ভিন্ন কিছু ব্যাপার চোখে পড়ত। নিজের আপেক্ষিক তত্ত্বের সূত্র ব্যবহার করে আইনস্টাইন হিসাব কষে দেখেন, এ ক্ষেত্রে পাথর থেকে বেরিয়ে আসা আলোর কম্পাঙ্ক ভিন্ন হবে। এ ঘটনাকে বলা হয় রিলেটিভিস্টিক ডপলার ইফেক্ট। পুলিশের গাড়ি বা অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার সময় বা কাছে আসার সময় সাইরেনের শব্দ যে রকম বদলে যায়, এটাও অনেকটা সে রকম। সাইরেনের ক্ষেত্রে শব্দের তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিচ্যুতি হয়।

‎

‎

‎পাথর থেকে তাপ বেরিয়ে আসবে অবলোহিত আলো রূপে। মানে, ইনফ্রারেড ফোটন। আপনি যদি ওই পাথরের পাশে মহাকাশে ভাসেন, তাহলে সেখানে কিছুই অদ্ভুত বলে মনে হবে না।

‎আবার আমাদের কাছ থেকে কোনো নক্ষত্র বা ছায়াপথ দূরে গেলে আলোর লোহিত বিচ্যুতি ঘটে এবং কাছে আসতে থাকলে ঘটে নীল বিচ্যুতি। কিন্তু পাথরের আলোর ক্ষেত্রে ব্যাপারটি একটু অদ্ভুত। তার পেছনে রয়েছে আপেক্ষিকতার নিয়মকানুন। কারণ, কোনো ফোটনকে কখনোই আলোর চেয়ে বেশি জোরে বা ধীরে চলতে দেখা যায় না। এর নিট ফল হলো, পাথরের পাশে মহাকাশে ভাসমান কারও কাছে আর রকেটে চেপে দ্রুতবেগে চলা কারও কাছে পাথর থেকে আসা ফোটনের শক্তির পরিমাণ ভিন্ন ভিন্ন হয়। কিন্তু ফোটনগুলো তো দুই ক্ষেত্রেই একই, তাহলে পরিবর্তনটি হচ্ছে কার? নিঃসন্দেহে সেটি অন্য কিছু।

‎

‎আইনস্টাইনের মতে, পরিবর্তনটি হবে পাথরটির গতিশক্তির। কিন্তু কোনো বস্তুর গতিশক্তি আসে ভর ও বেগ থেকে। কিন্তু এখানে তো ফোটন নিঃসরণের সময় পাথরটির বেগের কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাই আইনস্টাইন শেষমেশ সিদ্ধান্তে এলেন, এখানে নিশ্চয়ই ভরের কোনো পরিবর্তন হয়েছে। তিনি অঙ্ক কষে দেখতে পান, পাথরটির ভরের যে পরিবর্তন হয়েছে, তার পরিমাণ ও ফোটনের শক্তির পরিমাণের সঙ্গে আলোর বেগের বর্গের গুণফলের সমান।

‎

‎অর্থাৎ ফোটনের শক্তি = (পাথরের ভরের পরিবর্তন) × (আলোর বেগ)২। মানে, পাথরটি থেকে যখন ফোটন বেরিয়ে আসছে, তখন পাথরের ভর বদলে যাচ্ছে। ভরের এই পরিবর্তনের পরিমাণ (একে যদি আলোর বেগের বর্গ দিয়ে গুণ করা হয়) আর ফোটনের শক্তি পরিমাণ একদম সমান। এ থেকে মনে হয়, পাথরটির কিছু ভর রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে শক্তিতে, যা ফোটন রূপে বেরিয়ে আসছে। এখানে মনে রাখতে হবে, ফোটনের কোনো ভর নেই, এরা বিশুদ্ধ শক্তি।

‎

‎কোনো বস্তুর গতিশক্তি আসে ভর ও বেগ থেকে। কিন্তু এখানে তো ফোটন নিঃসরণের সময় পাথরটির বেগের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

‎এই ফলাফল ছিল যুগান্তকারী। কারণ, হাজার হাজার বছর ধরে আমরা ভর ও শক্তিকে পুরোপুরি ভিন্ন বলে ভাবতাম। সেই ভাবনায় আঘাত করল আইনস্টাইনের এই ফলাফল। আইনস্টাইনের সমীকরণ থেকে দেখা গেল, ভর ও শক্তিকে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এবং একটিকে আরেকটিতে রূপান্তর করা সম্ভব।

‎

‎এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, এর মানে আসলে কী? বস্তুর ভরের মতো কোনো কিছু শক্তিতে রূপান্তর হয় কীভাবে? কিংবা শক্তি কীভাবে রূপান্তরিত হয় ভরে? শুরুতে মনে হতে পারে, পাথরের অণুর কিছু পরমাণু কোনো একভাবে ভেঙে বা ক্ষয় হয়। আর সেখান থেকেই বেরিয়ে আসে ফোটনগুলো। অবশ্য পাথরটির ভর কমে যাওয়ার এটি একটি উপায় হতে পারে। কিন্তু এখানে শুধু এটিই সব নয়। ফোটন বেরিয়ে আসার আগে বা পরে পাথরটির পরমাণুর সংখ্যা একই থাকে। কিন্তু কোনো একভাবে পাথরটির ভর কমে যায়।

‎

‎বিষয়টি বেশ উদ্ভট। কারণ, কোনো বস্তুর ভর এভাবে রূপান্তর হওয়ার বিষয়টিতে আমরা অভ্যস্ত নই। একটি ঘরে যদি এক কেজি ভরের কোনো ধাতব খণ্ড থাকে, ঘরের এসি চালু করার কারণে সেই ভর কমে বা বেড়ে যাবে বলে আমরা আশা করি না। আবার এক কেজি চিনি ফ্রিজে রাখলেও সেটি এক কেজিই থাকবে বলে আমরা আশা করি। কিন্তু আসলেই কি তা–ই? এখানে আসলে কী ঘটছে, তা বুঝতে হলে আমাদের আরেকটু গভীরে ঢুকতে হবে। বুঝতে হবে, কোনো বস্তুর ভর থাকার মানে আসলে কী। সেখান থেকেই মিলতে পারে এই ধাঁধার সমাধান।

‎

‎

‎পাথরের অণুর কিছু পরমাণু কোনো একভাবে ভেঙে বা ক্ষয় হয়। আর সেখান থেকেই বেরিয়ে আসে ফোটনগুলো। অবশ্য পাথরটির ভর কমে যাওয়ার এটি একটি উপায় হতে পারে।

‎

‎৩

‎সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানে আমরা নিজেরা কঠিন বা দৃঢ় উপাদান দিয়ে তৈরি বলে মনে করি। কথায় বলে, আমরা যা খাই, নিজেরাই ঠিক তা–ই। আর মানুষ তো বিভিন্ন পদার্থ বা বস্তু খায়। গাছপালার মতো সূর্যের আলো বা ভূতের মতো চাঁদের আলো খায় না। আবার চোখের সামনে নিজের হাত বা আঙুল সামনে আনলেও সেগুলো নিরেট শক্ত বা দৃঢ় দেখতে পাবেন। কাজেই সন্দেহ করার কোনো উপায় নেই।

‎

‎আরও কাছ থেকে যদি দেখা সম্ভব হতো, কিংবা বলা যায়, দেহের গাঠনিক উপাদানগুলোকে অনেক বড় করে দেখা সম্ভব হতো, তাহলে দেখা যেত, সেখানে খুব বেশি কিছু নেই। দেখা যেত, তার বেশির ভাগই ফাঁকা জায়গা। আপনার দেহের কোনো একটি পরমাণুর দিকে তাকালে দেখা যাবে, এর মধ্যে অনেক শূন্যস্থান রয়েছে। একটি পরমাণুর বেশির ভাগ ভর থাকে তার কেন্দ্রে বা নিউক্লিয়াসে। কারণ, পরমাণুর ইলেকট্রনের চেয়ে প্রোটন বা নিউট্রনের ভর প্রায় দুই হাজার গুণ বেশি।

‎

‎প্রোটন আর নিউট্রনকে ভাঙলে পাওয়া যায় কোয়ার্ক। একটি প্রোটন গঠিত হয় দুটি আপ কোয়ার্ক ও একটি ডাউন কোয়ার্ক পরস্পর যুক্ত হয়ে। নিউট্রন গঠিত হয় দুটি ডাউন আর একটি আপ কোয়ার্কে। কাজেই দেহের বেশির ভাগ ভর জোগায় আসলে এসব কোয়ার্ক। কিন্তু এখানেই আছে আরেক চমক। এই কোয়ার্কগুলোকে আলাদা করতে গেলেই একটি মজার ব্যাপার ঘটতে দেখা যায়। অবশ্য কোয়ার্কদের আলাদা করা যা–তা ব্যাপার নয়, খুব কঠিন। সেটা এখানে আলোচ্য নয়।

‎

‎প্রোটনের তিনটি কোয়ার্কের ভর একত্রে মাপা হলে ভর পাওয়া যাবে ৯৩৮ MeV/c2। এক MeV/c2 হলো প্রায় ১.৭×১০-৩০ কিলোগ্রাম। কিন্তু প্রোটনটি ভেঙে প্রতিটি কোয়ার্ক আলাদা আলাদাভাবে মাপা হলে আপ কোয়ার্কের ভর পাওয়া যাবে মাত্র ২ MeV/c2 এবং ডাউন কোয়ার্কের ভর পাওয়া যাবে ৪.৮ MeV/c2। সাধারণ যোগ করেই বোঝা যাচ্ছে, বিপুল পরিমাণ ভরের কোনো হদিস নেই এখানে। বেমালুম গায়েব! নিউট্রনের কোয়ার্কগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাহলে প্রোটনের বাকি ভর গেল কোথায়? এই গায়েবি ভর আসে কোথা থেকে?

‎

‎

‎স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, আলাদাভাবে কোয়ার্কদের খুব বেশি ভর নেই। প্রতিটির ভর প্রোটনের মোট ভরের মাত্র ১ শতাংশ। তারপরও কোয়ার্ক তিনটিকে একত্র করলে তাদের ভর ম্যাজিকের মতো প্রায় ১০০ গুণ বেড়ে যায়। যেন তিনটি লেগো খণ্ড একসঙ্গে জুড়ে দিলাম, আর বলা নেই, কওয়া নেই হুট করে তার ভর হয়ে গেল ৩০০ লেগো খণ্ডের সমান। সুকুমার রায়ের ‘হ য ব র ল’র মতো। ‘ছিল রুমাল, হয়ে গেল একটা বেড়াল’। এর মানেটা কী? হুট করে প্রোটনে এই ভর এল কোথা থেকে?

‎

‎এর উত্তরটা সরল, কিন্তু বিস্ময়কর। আসলে তিনটি কোয়ার্ক একত্র হয়ে গঠন করে প্রোটন বা নিউট্রন। তিনটি কোয়ার্ককে একত্র করতে যে শক্তির প্রয়োজন, প্রোটন বা নিউট্রনের বাকি ভর আসে সেই শক্তি থেকে। আগেই দেখেছি, শক্তিও ভরের মতো আচরণ করে। ধরা যাক, দুটি কণার বন্ধন হিসেবে তাদের মাঝখানে সামান্য কিছু শক্তি আটকে আছে। দেখা যাবে, ওই শক্তিকে অনেক ঠেলা–ধাক্কা দিয়ে চেষ্টা করেও সরানো যাচ্ছে না। অনেক বেশি ভরকে নাড়ানো যেমন কষ্টকর, এটিও অনেকটা সে রকম। কিন্তু কণা দুটিকে ওখান থেকে সরিয়ে নিয়ে শক্তিটুকু ক্ষয় করে ফেলা যায়, তাহলে কণা দুটিকে সহজেই নাড়ানো যায়। অন্য কথায়, শক্তির নিজের মধ্যেই জড়তা আছে।

‎

‎শুধু তা–ই নয়, মহাকর্ষ বলও অনুভব করে শক্তি। আটকে পড়া সামান্য শক্তিও ভরের মতো কোনো স্থানকে বাঁকিয়ে দিতে পারে এবং অন্য বস্তুকে আকর্ষণও করতে পারে। কাজেই প্রোটনের ক্ষেত্রে তার ভর হলো তিনটি কোয়ার্ক কণার ভর এবং তাদের একত্রে আটকে রাখা শক্তির যোগফল। কোয়ার্ক কণাদের একত্রে আটকে রাখে শক্তিশালী পারমাণবিক বল। আরও সঠিকভাবে বললে, কোয়ার্কদের শক্ত বন্ধনে আটকে রাখে শক্তিশালী পারমাণবিক বলবাহী গ্লুয়ন কণা।

‎

‎শুধু প্রোটনের ক্ষেত্রেই নয়, প্রকৃতির সব ক্ষেত্রেই এটি সত্য। কাজেই আপনার বা একজন মানুষের মোট ভর আসলে তার সব কণা এবং কণাগুলোকে একত্রে আটকে রাখতে প্রয়োজনীয় শক্তির যোগফল। সুতরাং কোনো বস্তুর সব কণা আলাদা আলাদা মাপা হলে তার পরিমাণ আদি বস্তুর ভরের চেয়ে অনেক কম পাওয়া যাবে।

‎

‎প্রোটন আর নিউট্রনকে ভাঙলে পাওয়া যায় কোয়ার্ক। একটি প্রোটন গঠিত হয় দুটি আপ কোয়ার্ক ও একটি ডাউন কোয়ার্ক পরস্পর যুক্ত হয়ে। নিউট্রন গঠিত হয় দুটি ডাউন আর একটি আপ কোয়ার্কে।

‎তাহলে হারিয়ে যাওয়া ভরের সমতুল্য শক্তিটি নির্ণয় করা যাবে কীভাবে? সেটি তো আগেই বলা হয়েছে। হ্যাঁ, ঠিকই অনুমান করেছেন, ওই বিখ্যাত সমীকরণ E=mc2 ব্যবহার করে। এই সমীকরণ আসলে আংশিকভাবে সেটিই প্রকাশ করে; অর্থাৎ ভর আর শক্তি সমতুল্য। কাজেই সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানে আমাদের দেহের বেশির ভাগ বা ৯৯ শতাংশ আমরা ভর হিসেবে ভেবে নিলেও সেগুলো আসলে শক্তি। তাহলে প্রশ্ন আসে, বাকি ১ শতাংশ আসলে কী? সেগুলো আসলেই পদার্থ। তবে তার পরিমাণও কিন্তু খুব বেশি নয়।

‎

‎গত ১০০ বছরে মৌলিক কণার ভরের প্রকৃতি সম্পর্কে আমরা অনেক কিছুই জানতে পেরেছি। কোয়ার্ক এবং ইলেকট্রনকে অনেক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেও দেখা হয়েছে। কিন্তু এর সেগুলো তার চেয়ে ছোট কোনো কণা দিয়ে তৈরি বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কাজেই বলা যায়, অন্য কোনো ছোট কণা একত্র করতে ব্যবহৃত কোনো শক্তি তাদের ভরের পেছনে জড়িত নেই। তাহলে তাদের ভরের উৎস কী? কোথা থেকে আসে এই ভর?

‎

‎ইলেকট্রনের প্রকৃতি সম্পর্কে সেই ১৮৮০–এর দশকে জে জে টমসন যে রকম ধারণা করেছিলেন, সেটি সঠিক পথেই ছিল। তখন দেখা গিয়েছিল, ইলেকট্রনকে নাড়ানো বেশ কঠিন কাজ। কারণ, এই কণা চৌম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরি করে। আরও অনেক পরে জানা গেল, এখানে আরেকটি ক্ষেত্রও আছে, যেটা তাদের পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। সেটি হলো হিগস ফিল্ড বা হিগস ক্ষেত্র। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে হিগস বোসন কণা। ২০১২ সালে লার্জ হ্যার্ডন কলায়ডারে এই কণার অস্তিত্ব শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

‎

‎কোয়ান্টাম তত্ত্বমতে, গোটা মহাবিশ্বেই এই কোয়ান্টাম ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ। সেগুলো বস্তুকণাদের ঘাড়ে চড়াও হয়ে টানাটানি করছে। তাই তাদের নাড়ানো কঠিন। এখান থেকেই আসলে প্রতিটি কণার ভর আসে। প্রায় প্রতিটি কণাই হিগস ফিল্ডের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে। তবে কণার ভরের উৎসের এটি হলো আংশিক ব্যাখ্যা। পুরো ব্যাখ্যাটি হলো, ভর আসে হিগস ক্ষেত্রের শক্তি থেকে। কিছু কণা হিগস ক্ষেত্রে সংরক্ষিত শক্তির সঙ্গে অনেক বেশি মিথস্ক্রিয়া করে। তাই সেসব কণাকে নাড়ানো কঠিন।

‎

‎আবার হিগস ক্ষেত্রের সঙ্গে কিছু কণার মিথস্ক্রিয়া বেশ দুর্বল। সেসব কণা নাড়ানোও বেশ সহজ। কাজেই প্রতিটি কণার ভর নির্ভর করে হিগস ক্ষেত্রের শক্তির সঙ্গে ওই কণার যোগাযোগ কতটুকু, তার ওপর। প্রায় ১৩৭০ কোটি বছর আগে মহাবিস্ফোরণে মহাবিশ্বের জন্মের পর সেখানে ছিল কেবল তাপ আর শক্তি। তা থেকে জন্মেছিল কিছু কণা। শুরুতে তারা ভরহীন ছিল। কিন্তু হিগস বোসন কণার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে কিছু কণা হয়ে গেল ভারী, বাকিগুলো হিগস-বোসন কণার ধার ধারেনি। তাই সেগুলো আজও ভরহীন রয়ে গেছে। মহাবিশ্বে তারাই ছুটে বেড়ায় আলোর বেগে। যেমন ফোটন।

‎

‎এখান থেকে আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারি। কোয়ান্টাম তত্ত্বমতে, কোয়ার্ক ও ইলেকট্রন কণা আসলে কোয়ান্টাম ক্ষেত্রের ছোট্ট ঢেউ ছাড়া কিছু নয়। আর এই ক্ষেত্র ছড়িয়ে আছে গোটা মহাবিশ্বে। কোয়ান্টাম তত্ত্বে একটি কণা হলো শক্তির বিস্ফোরণ বা শক্তির ঝলক। চিৎকার করলে বা জোরে শব্দ করলে বাতাসে শব্দতরঙ্গের যেমন ঢেউ ওঠে কিংবা সাগরের পানিতে যেমন ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে, এটিও তেমন। কাজেই কণারা নিজেও আসলে একধরনের শক্তি।

‎

‎প্রায় ১৩৭০ কোটি বছর আগে মহাবিস্ফোরণে মহাবিশ্বের জন্মের পর সেখানে ছিল কেবল তাপ আর শক্তি। তা থেকে জন্মেছিল কিছু কণা। শুরুতে তারা ভরহীন ছিল।

‎

‎৪

‎কাজেই এখান থেকে কয়েকটা সিদ্ধান্তে আসা যায়। কোনো বস্তুর ভর আসলে ওই বস্তুর ভেতরে কণাগুলোকে আটকে রাখার জন্য তাদের ভেতরের বন্ধনের শক্তি। আবার প্রতিটি কণার ভর আসলে এক প্রকার শক্তি। এর মাধ্যমে আরেকটি বিস্ময়কর উপসংহারে আসা যায়। সেটি হলো, সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানে আমরা যেটাকে ভর বলে মনে করি, তার কোনো অস্তিত্ব নেই। আসলে সবকিছুই শক্তি।

‎

‎এবার সেই মহাকাশের পাথরের কাছে ফেরা যাক। মহাকাশের পাথরটি আসলে ফোটন বিকিরণের সময় এভাবে ভর হারাতে পারে। তবে বস্তুকে শক্তিতে রূপান্তরিত করার কারণে সেটি ভর হারায় না। সব বস্তুই তো আগে থেকেই শক্তি। কাজেই পাথরটি আসলে একধরনের শক্তি থেকে আরেক শক্তিতে রূপান্তরিত হয় মাত্র। এ ক্ষেত্রে পাথরটি তার অণুগুলোর গতি বা কম্পনের শক্তিকে রূপান্তর করে ফোটনে।

‎

‎কাজেই মহাকাশে এরপর কোনো পাথর দেখলে ভেবে বসবেন না যে সেটার ভর ও শক্তি আছে; বরং ভাববেন, পাথরটি আসলে একগাদা শক্তির গোলা। তার কিছু শক্তি আছে কণার রূপে, কিছু শক্তি আছে কণাগুলোর ভেতর বন্ধন হিসেবে আর কিছু আছে কণাদের গতি হিসেবে।

‎

‎অবশ্য বিপরীতটাও ঘটে। পাথরটি সূর্যের আলো শোষণ করে উত্তপ্ত হয়ে উঠলে তাতে শক্তি যোগ হবে। আর বাড়তি শক্তির মানে পাথরটি নাড়ানো আরও কঠিন হবে। মহাকর্ষের কারণে তার ভরও বেড়ে যাবে। অর্থাৎ, কোনো উত্তপ্ত পাথর আসলে ঠান্ডা পাথরের চেয়ে বেশি ভারী। অবশ্য পার্থক্যটা খুব সামান্য।

‎

‎কারণ, সমতুল্য ভরের পরিবর্তন নির্ণয় করতে হলে ফোটনের শক্তিকে আলোর বেগের বর্গ দিয়ে ভাগ দিতে হয়। আলোর বেগের বর্গ অনেক বড় একটি সংখ্যা। তাই দেখা যাবে, এ ক্ষেত্রে সমতুল্য ভরের পরিমাণ অনেক কম পাওয়া যাবে।

‎

‎হিগস ও শক্তি পরস্পরের সমতুল্য। ইদানীং পদার্থবিদেরা বলতে শুরু করেছেন, ভরও আসলে শক্তির একটা রূপ। এর কারণ, অন্য কিছু ধরনের শক্তি দেখা যায়। যেমন ফোটন। এর শক্তি আছে, কিন্তু কোনো ভর নেই। তবে ভর ও শক্তির ভেতরের গভীর সম্পর্কটা আসলে কী, তা বিখ্যাত সমীকরণ থেকে জানা যায় না।

‎

‎ভর যে শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে, এটুকু জানাই আসলে এই দুইয়ের সবটুকু জানা নয়। আমরা জেনেছি, সব ভরই আসলে শক্তি। কোনো বস্তুর কণাদের শক্তি হয় তাদের বন্ধনের মধ্যে কিংবা হিগস ফিল্ডের সঙ্গে তাদের মিথস্ক্রিয়ার ফলাফল।

‎

‎তবে শক্তির যে জড়তা আছে বা তার যে ভর আছে, এই ধারণা হজম করতে অনেকের জন্যই কষ্টকর। আসলে অনেক বছর ধরে ভর সম্পর্কে আমরা ভুলভাবে চিন্তা করেছি। সেই ভুল সহজে ভাঙার নয়। নতুন ধারণা অনুসারে, বস্তু বা পদার্থ বলতে আসলে কিছু নেই, সবই শক্তি। এ ধারণা এখন মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দিয়েছে। এখন পদার্থবিদেরা মহাবিশ্বে বস্তু আর শক্তিতে পরিপূর্ণ বলে ভাবেন না, বরং গোটা মহাবিশ্ব আছে শুধু শক্তি। এমনকি আমরাও ব্যতিক্রম নই।

‎

‎সত্যি বলতে, আমরা হলাম শক্তি দিয়ে তৈরি দীপ্তিমান, আলোকময় এক সত্তা। নিজের ভেতর বিপুল শক্তিটা টের পাচ্ছেন? টের পাচ্ছেন নিজের ভেতরের প্রায় অফুরন্ত আলোর ভান্ডারটা? ব্যাপারটি জেনে খুশি লাগছে, তা–ই না? তবে সাবধান! তথ্যটুকু জেনে এখনই আপনার চোখ থেকে লেজার রশ্মি ছুড়তে চেষ্টা করবেন না, কিংবা আঙুল উঁচিয়ে কাউকে ভস্ম করতেও যাবেন না। তাতে কোনো লাভ হবে না।

‎

‎লেখক: আবুল বাসার

‎নির্বাহী সম্পাদক, বিজ্ঞানচিন্তা

‎সূত্র: ফ্রিকোয়েন্টলি আক্সড কোয়েশ্চনস অ্যাবাউট দ্য ইউনিভার্স/ জর্জ চ্যাম ও ড্যানিয়েল হোয়াইটসন; ঈশ্বরকণা, মানুষ ইত্যাদি/ পথিক গুহ; উইকিপিডিয়া


‎

মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬

হোয়াইট হোল কি সত্যিই আছে

হোয়াইট হোল কি সত্যিই আছে

বর্তমানে ব্ল্যাকহোলের মতোই বহুল আলোচিত মহাজাগতিক বস্তু হোয়াইট হোলস। কিন্তু ব্ল্যাকহোলের পরীক্ষামূলক প্রমাণ থাকলেও হোয়াইট হোলের তেমন কোনো প্রমাণ এখনো মেলেনি। গাণিতিকভাবে বাস্তব জগতে সময়ের উল্টো দিকে প্রবাহ সম্ভব নয় বলে হোয়াইট হোলের অস্তিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ। হোয়াইট হোলস কি তবে বাস্তবে থাকা সম্ভব?

ব্ল্যাকহোল বনাম হোয়াইট হোল

জুতা সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ—নিউটনের তৃতীয় সূত্র ব্যবহার হচ্ছে যত্রতত্র। প্রয়োজন থাকুক আর না থাকুক—উল্টো কিছু দেখলেই আমরা বলি, প্রত্যেক ক্রিয়ারই বিপরীত ক্রিয়া আছে। ব্ল্যাকহোলেও কি তা–ই? ব্ল্যাকহোলের মেকানিজমে নিউটনের তৃতীয় সূত্রের কতটুকু উপযোগিতা আছে, সে নিয়ে তর্ক হতে পারে। কিন্তু ওই প্রবাদ অর্থে প্রশ্ন হতেই পারে, যদি ব্ল্যাকহোল সবকিছু গ্রাস করে নেয়, তাহলে কি এমন কিছু আছে, যা কিছুই শোষণ করে না, বরং সবকিছু ফিরিয়ে দেয়?

এমন কোনো জিনিসের প্রমাণ নেই, তবে তাত্ত্বিকভাবে আছে হোয়াইট হোল নামের এক মহাবৈশ্বিক দানব। ব্ল্যাকহোলের সম্পূর্ণ উল্টো চরিত্র। ব্ল্যাকহোল সবকিছু গ্রাস করে নেয় বলে সেটা সম্পূর্ণ কালো। অন্যদিকে হোয়াইট হোল কিছুই শোষণ করে না, বরং ভেতর থেকে সবকিছু বের করে দেয়। তাই মহাবিশ্বের সবচেয়ে উজ্জ্বল বস্তু এই হোয়াইট হোল। অথচ সেটাই এখনো দেখতে পারছি না। ব্যাপারটা অদ্ভুত না!

ব্ল্যাকহোল সবকিছু গ্রাস করে নেয় বলে সেটা সম্পূর্ণ কালো
ছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

ধরা যাক, আপনার একটি প্রবল গতির মহাকাশযান আছে। সেটিতে চড়ে আপনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন মহাকাশের অলিগলিতে। ছুটছেন তো ছুটছেন। কত গ্রহ-নক্ষত্রকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন, কত গ্যালাক্সি দেখতে পাচ্ছেন দূর থেকে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের মতো। হঠাৎ মহাকাশের এক অন্ধকার কোণে চোখে পড়ল একটি আলোর বৃত্ত। তার ঠিক মাঝখানটা ভয়ানক কালো। কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। আপনার যদি যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক জ্ঞান থাকে, তাহলে সহজেই বুঝতে পারবেন, আলোর বৃত্তটার ঠিক মাঝখানে রয়েছে একটি ব্ল্যাকহোল।

আরও পড়ুন
ব্ল্যাকহোল সবকিছু গ্রাস করে নেয় বলে সেটা সম্পূর্ণ কালো। অন্যদিকে হোয়াইট হোল কিছুই শোষণ করে না, বরং ভেতর থেকে সবকিছু বের করে দেয়। তাই মহাবিশ্বের সবচেয়ে উজ্জ্বল বস্তু হোয়াইট হোল।

আরও নির্দিষ্ট করে বলা যায়, মাঝখানের কালো অংশ আসলে ব্ল্যাকহোলের মুখ। বৈজ্ঞানিক ভাষায় সেটাকে বলা হয় ‘ইভেন্ট হরাইজন’ বা ঘটনা দিগন্ত। ঘটনা দিগন্ত আসলে আমাদের চিরচেনা জগতের বর্ডারলাইন। সেই লাইন পার হলেন তো পড়ে গেলেন ব্ল্যাকহোলের অন্ধকূপে। সেখান থেকে ফিরে আসার কোনো পথ নেই। ব্ল্যাকহোলের সীমারেখা পার হলে সব বস্তুই ব্ল্যাকহোলের প্রবল মহাকর্ষীয় টানে ভেতরে গিয়ে পড়ে। সেখান থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই।

কিন্তু এবার একটু অ্যাডভান্স হোন, বিজ্ঞানের আধুনিক তত্ত্বগুলোর খুঁটিনাটি তালাশ করুন। তারপর চলে যান মহাকাশ ভ্রমণে। এবারও আপনার চোখে পড়ল এমন কোনো উজ্জ্বল বৃত্ত, যার ভেতরটা ঘুটঘুটে কালো। এবার কি আপনি নিশ্চিত করে বলতে পারবেন, যেটা দেখছেন, সেটা ব্ল্যাকহোল?

হোয়াইট হোলেরও ইভেন্ট হরাইজন আছে। তার চার পাশে আছে উজ্জ্বল আলোকবলয়
ছবি: গেটি ইমেজ

না, তা পারবেন না। কারণ, আপনি এখন ভালো করেই জানেন, ব্ল্যাকহোল আর হোয়াইট হোল খোলা চোখে দেখতে একই রকম। দূর থেকে দেখে পার্থক্য বোঝা মুশকিল।

কিন্তু কেন এমন হলো? সম্পূর্ণ উল্টো চরিত্রের হওয়ার পরও কেন তাদের চেহারা একই রকম?

ব্ল্যাকহোলের যেমন ভর, ঘূর্ণন বা স্পিন আছে, হোয়াইট হোলেরও তেমনি ভর ও ঘূর্ণন আছে। হোয়াইট হোলেরও ইভেন্ট হরাইজন আছে। তার চার পাশে আছে উজ্জ্বল আলোকবলয়। তাই খোলা চোখে দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য খুঁজে বের করা মুশকিল। কিন্তু মূল পার্থক্যের জায়গা হলো ওই ইভেন্ট হরাইজন। ব্ল্যাকহোলের ইভেন্ট হরাইজন সবকিছু শোষণ করে নেয়, কিছুই ফিরিয়ে দেয় না, এমনকি আলোর মতো ভরহীন শক্তিও এর ভেতরে একবার ঢুকে পড়লে আর বেরিয়ে আসতে পারে না।

আরও পড়ুন
ব্ল্যাকহোলের যেমন ভর, ঘূর্ণন বা স্পিন আছে, হোয়াইট হোলেরও তেমনি ভর ও ঘূর্ণন আছে। হোয়াইট হোলেরও ইভেন্ট হরাইজন আছে। তার চার পাশে আছে উজ্জ্বল আলোকবলয়।

অন্যদিকে হোয়াইট হোলের ইভেন্ট হরাইজন কোনো কিছুই শোষণ করে না, বরং হোয়াইট হোলের ভেতরকার সব পদার্থ ইভেন্ট হরাইজনের বাইরে বেরিয়ে এসে একটা উজ্জ্বল বলয় তৈরি করে। এমনকি আপনি যদি বাইরে থেকে কোনো বস্তু হোয়াইট হোলের ভেতর নিক্ষেপ করেন, সেটা ভেতরে ঢুকবে না, আপনি নিজেও হোয়াইট হোলের কাছে গিয়ে ইভেন্ট হরাইজনের বর্ডারলাইন পেরোতে পারবেন না কিছুতেই। বরং এক প্রবল বিকর্ষণ বল আপনাকে সেখান থেকে ছুড়ে বাইরে নিক্ষেপ করবে। এরপরও ইভেন্ট হরাইজনের মাঝখানটা ঠিকই ঘুটঘুটে অন্ধকার। আর সে কারণেই ব্ল্যাকহোল আর হোয়াইট হোলের বাহ্যিক চেহারায় কোনো পার্থক্য নেই।

হোয়াইট হোল কিছুই শোষণ করে না, অথচ নিজের ভেতর থেকে ক্রমাগত ভর-শক্তি উগরে দেয়। এত ভর তাহলে সে কোথায় পায়?

হোয়াইট হোলের ভেতরকার সব পদার্থ ইভেন্ট হরাইজনের বাইরে বেরিয়ে এসে একটা উজ্জ্বল বলয় তৈরি করে
ছবি: উইকিমিডিয়া ক্রিয়েটিভ কমন্স

উত্তর খুব সোজা, ব্ল্যাকহোলের কাছ থেকে ভরের জোগান পায় হোয়াইট হোল। ব্ল্যাকহোল যা কিছু শোষণ করে ইভেন্ট হরাইজনের মুখ দিয়ে, সেটাই ক্রমাগত বাইরে বের করে দেয় আরেকটা মুখ দিয়ে। অর্থাৎ ব্ল্যাকহোলের ভেতরে ঢোকা ভর-শক্তিগুলোই হোয়াইট হোল থেকে বেরিয়ে আসে।

তাহলে কি ব্ল্যাকহোলের উল্টো পিঠে আরেক দরজা আছে, যেটা দিয়ে সবকিছু বেরিয়ে আসে?

ব্যাপার অনেকটা সে রকম। কিন্তু উল্টো পিঠ বলতে আমরা সাধারণত স্থানের উল্টো পিঠ বুঝি। যেমন একটা টানেলের ওপাশে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য আরেকটা মুখ থাকে। কিন্তু হোয়াইট হোল ঠিক টানেলের উল্টো পাশের মুখ নয়। এটা বরং সময়ের উল্টো দিকে থাকা আরেকটা মুখ।

আরও পড়ুন
ব্ল্যাকহোল যা কিছু শোষণ করে ইভেন্ট হরাইজনের মুখ দিয়ে, সেটাই ক্রমাগত বাইরে বের করে দেয় আরেকটা মুখ দিয়ে। অর্থাৎ এর ভেতরে ঢোকা ভর-শক্তিগুলোই হোয়াইট হোল থেকে বেরিয়ে আসে।

সিঙ্গুলারিটির মৃত্যু!

তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীদের বড় ভয় সিঙ্গুলারিটি নিয়ে। সিঙ্গুলারিটি হলো অসীম ঘনত্বের একটা বিন্দু। অনেকে এটাকে পরম বিন্দুও বলেন। ব্ল্যাকহোলের আধুনিক ধারণাটা এসেছিল ১৯১৬ সালে। জার্মান বিজ্ঞানী কার্ল শোয়ার্জশিল্ড যুদ্ধক্ষেত্রে জীবনঘাতী অসুখের সঙ্গে লড়তে লড়তে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার একটা গাণিতিক সমাধান বের করেন। সেই সমাধানে তিনি দেখান, কোনো ব্ল্যাকহোল যদি যথেষ্ট ভারী হয়, তাহলে সেটা তার চারপাশের স্থান-কালকে অসীমভাবে বাঁকিয়ে দেবে। সেই বক্র স্থান-কালের ভেতর কোনো বস্তু, এমনকি আলোও একবার ঢুকলে আর বেরিয়ে আসতে পারবে না। শোয়ার্জশিল্ডের সেই তত্ত্ব বহুদিন তত্ত্ব হিসেবেই রয়ে যায়।

১৯৩০-এর দশকে সুব্রাহ্মনিয়ান চন্দ্রশেখর ও রবার্ট ওপেনহাইমারের গবেষণা শোয়ার্জশিল্ডের তত্ত্বে সরাসরি প্রভাব না ফেললেও অক্সিজেনটা সরবরাহ করে যায় টিকিয়ে রাখার জন্য। তারপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল, কণাপদার্থবিজ্ঞানের মহা মহা সব গবেষণায় মহাকাশবিদ্যা কিছুটা পথ হারিয়ে ফেলে, ব্ল্যাকহোল তত্ত্বও তাই চাপা পড়ে থাকে অন্ধকূপে। ১৯৬০-এর দশকে মার্কিন জন হুইলার আবার বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি মহাবিশ্বের দিকে ফেরাতে সক্ষম হন। তিনিই শোয়ার্জশিল্ডের সেই আলোখেকো বস্তুটার নাম দেন।

শিল্পীর কল্পনায় একটি কৃষ্ণগহ্বরের ছবি। কৃষ্ণগহ্বরের কেন্দ্র সিঙ্গুলারিটি বা পরম বিন্দুর উদাহরণ
ছবি: সংগৃহীত

১৯৬০ সালে গণিতবিদ মার্টিন ডেভিড ক্রাসকাল শোয়ার্জশিল্ডের ব্ল্যাকহোল নিয়ে কিছু কাজ করেছিলেন। তিনি শোয়ার্জশিল্ডের তত্ত্বটা নিজে করেন। স্থান ও কালের তত্ত্বটার বিকল্প একটা সমাধান বের করেন তিনি। তাতে দেখা যায়, ব্ল্যাকহোলে মিরর ইমেজ বা উল্টো প্রতিবিম্ব থাকা সম্ভব। তবে নতুন এ কাঠামোর গুরুত্ব বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলেন ক্রাসকাল। আসলে তিনি আধুনিক হোয়াইট হোলের একটা গাণিতিক প্রতিরূপ তৈরি করে ফেলেছিলেন নিজের অজান্তে।

আরও পড়ুন
১৯৩০-এর দশকে সুব্রাহ্মনিয়ান চন্দ্রশেখর ও রবার্ট ওপেনহাইমারের গবেষণা শোয়ার্জশিল্ডের তত্ত্বে সরাসরি প্রভাব না ফেললেও অক্সিজেনটা সরবরাহ করে যায় টিকিয়ে রাখার জন্য।

পরে ১৯৬৫ সালে পেনরোজ একটি গাণিতিক তত্ত্ব দাঁড় করান। সেই তত্ত্বে তিনি দেখান, কোনো নক্ষত্রকে যদি ব্ল্যাকহোলে পরিণত হতে হয়, তাহলে সেই নক্ষত্রকে নিজের কেন্দ্র বরাবর ভেঙে পড়তে হবে। নক্ষত্রটির সব ভর গিয়ে জড়ো হবে একটা বিন্দুতে। সেই বিন্দু হবে আয়তনহীন। তাই তার ভর ও ঘনত্ব হবে অসীম। অসীম ঘনত্বের এ ভরকেই সিঙ্গুলারিটি বলে অভিহিত করেন পেনরোজ। পরে স্টিফেন হকিং দেখান, আমাদের মহাবিশ্বের জন্মও হয়েছিল অসীম ঘনত্বের একটা সিঙ্গুলারিটি থেকে। সেই বিন্দুই বিগ ব্যাংয়ের মাধ্যমে স্থান-কালে প্রসারিত হয়ে মহাবিশ্বের জন্ম দিয়েছে।

কিন্তু আধুনিক বিগ ব্যাং থিওরি ইনফ্লেশন থিওরিকে বেশি সমর্থন করে। আর ইনফ্লেশনারি বিগ ব্যাং থিওরিতে সিঙ্গুলারিটির দরকার হয় না। সত্যি বলতে কি, পদার্থবিজ্ঞানীরা সিঙ্গুলারিটিকে ভয় পান। কারণ, এই বিন্দুতে গিয়ে পদার্থবিজ্ঞানের সব তত্ত্ব অকেজো হয়ে পড়ে। সুতরাং সিঙ্গুলারিটি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীদের এগিয়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ করে দেয়। তাই তাঁরা এটাকে পারতপক্ষে এড়িয়ে চলার চেষ্টাই করেন। ইনফ্লেশন থিওরি কসমোলজিকে সিঙ্গুলারিটি থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ব্ল্যাকহোলে সিঙ্গুলারিটি আছে বহাল তবিয়তে। বিজ্ঞানীরা ব্ল্যাকহোলের ভেতরের খবর জানতে চান। সেটার জন্য মূল বাধা সিঙ্গুলারিটি। আর এ বাধা টপকাতে কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে সিঙ্গুলারিটির মৃত্যু।

আরও পড়ুন
সিঙ্গুলারিটি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীদের এগিয়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ করে দেয়। তাই তাঁরা এটাকে পারতপক্ষে এড়িয়ে চলার চেষ্টাই করেন। ইনফ্লেশন থিওরি কসমোলজিকে সিঙ্গুলারিটি থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।

প্যারালাল ইউনিভার্সের সঙ্গে সংযোগ

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সময় উল্টো দিকে চলে না। কিন্তু যদি অন্য কোনো প্যারালাল ইউনিভার্স থাকে, সেখানে হয়তো সময় চলে আমাদের বিপরীত দিকে। ব্ল্যাকহোলের মুখ আমাদের মহাবিশ্বে আর হোয়াইট হোলের মুখ থাকতে পারে সেই সমান্তরাল মহাবিশ্বে। সে ক্ষেত্রে ব্ল্যাকহোল আর হোয়াইট হোলের মধ্যে একটা সংযোগ দরকার। সেই সংযোগ হতে পারে কোয়ান্টাম টানেলিংয়ের মাধ্যমে। নিজের ছাত্র হ্যাল হ্যাগার্ডের এই অনুমানকেও উড়িয়ে দেননি রোভেল্লি। হ্যালের এই ধারণা যদি সত্যি হয়, তাহলে আমাদের মহাবিশ্বে যে হোয়াইট হোলের দেখা পাচ্ছি না, তার একটা কারণ অন্তত পাওয়া গেল।

একই রকম ব্যাপার ধরা হয় অ্যান্টিম্যাটার বা প্রতিপদার্থের ক্ষেত্রেও। অ্যান্টিম্যাটার কণাদের এমনি মহাবিশ্বে পাওয়া যায় না। নোবেলজয়ী মার্কিন পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যান রীতিমতো প্রমাণ করে দেখিয়েছিলেন, কণারা সময়ের বিপরীত দিকে চলতে পারে। এ সময় কণারা তার যমজ প্রতিকণার সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে আবার সময়ের সামনের দিকে অগ্রসর হয়। আর এসব প্রতিকণার জন্ম হয় কোয়ান্টাম ফ্ল্যাকচুয়েশন নামের বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

ধারণা করা হয়, এসব প্রতিকণার বাস প্যারালাল ইউনিভার্সে। বিশেষ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে যদি প্রতিকণাদের আমাদের মহাবিশ্বে ডেকে আনা হয়, তখন প্রতিকণার যমজ স্বাভাবিক বস্তুকণাটি চলে যায় প্যারালাল ইউনিভার্সে।

হোয়াইট হোলের মুখ যদি প্যারালাল ইউনিভার্সেই থাকে, তাহলে সেটাকে কি আমাদের মহাবিশ্বে পাওয়া সম্ভব? তবে এ ধারণাও হয়তো অতিকল্পনা। তবু এটাকে একটা যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করাই যায়।

আরও পড়ুন
অ্যান্টিম্যাটার কণাদের এমনি মহাবিশ্বে পাওয়া যায় না। নোবেলজয়ী মার্কিন পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যান রীতিমতো প্রমাণ করে দেখিয়েছিলেন, কণারা সময়ের বিপরীত দিকে চলতে পারে।

সময়ের উল্টো পথে

একসময় কসমোলজিস্টরা ধারণা করতেন, সিঙ্গুলারিটির আগল ভাঙা ব্ল্যাকহোলের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু আধুনিক হোয়াইট হোল তত্ত্ব বোধ হয় সিঙ্গুলারিটির হাত থেকে পদার্থবিজ্ঞানকে মুক্ত করতে চলেছে (আদৌ যদি হোয়াইট হোলের দেখা মেলে)! হোয়াইট হোলকে হালে জনপ্রিয় করে তুলেছেন ইতালিয়ান তাত্ত্বিক পদার্থবিদ ও ফ্রান্সের ‘সেন্টার দে ফিজিক থিওরিক’-এর গবেষক কার্লো রোভেল্লি। তিনি হোয়াইট হোলস নামে আস্ত একটি বই লিখেছেন। তাতে দেখিয়েছেন, ব্ল্যাকহোলের সিঙ্গুলারাটিতে পৌঁছানের আগেই বস্তুকণাগুলো বাউন্স করে সময়ের উল্টো দিকে গিয়ে হোয়াইট হোলে রূপ নেয়। অর্থাৎ হোয়াইট হোল আসলে ব্ল্যাকহোলেরই টাইম রিভার্সাল রূপ। টাইম রিভার্সাল ব্যাপারটা এ যুগে বোঝা খুব সহজ।

আপনার স্মার্টফোনটি নিয়ে একটি ছোট্ট গর্তের কাছে যান। সঙ্গে নিয়ে যান আপনার কয়েকজন বন্ধুকে। তাদের হাতে কয়েক শ মার্বেল দিয়ে বলুন চারদিক থেকে সেগুলো গড়িয়ে গর্তের ভেতর ফেলতে। মার্বেলগুলো যখন গর্তের ভেতর পড়ছে, আপনি তখন গর্তের মুখের ভিডিও করুন। এক মিনিটের ভিডিওই যথেষ্ট। ভিডিওটি ঠিকঠাকমতো চালিয়ে দেখুন সেটা ঠিকমতো হয়েছে কি না। এবার ভিডিওটি উল্টো দিকে, অর্থাৎ পেছনের দিকে চালান। এখানে ভিডিওটির সবশেষ ফ্রেমটা সবার আগে দেখাবে এবং প্রথম ফ্রেমটা দেখাবে সবার শেষে। উল্টো ভিডিওতে আপনি কী দেখলেন? গর্তের মুখ থেকে মার্বেলগুলো বেরিয়ে আসছে!

আবার আপনি ভিডিওটি স্বাভাবিক মোডে চালান, দেখবেন একগুচ্ছ মার্বেল চারপাশ থেকে গিয়ে গর্তে পড়ছে। ব্ল্যাকহোল আর হোয়াইট হোলের ব্যাপারটাও এ রকম। সময় যখন সামনের দিকে চলছে, বস্তুকণা আর আলো ঘূর্ণিপাকের মতো করে ব্ল্যাকহোলের ঘটনা দিগন্তের ভেতর ঢুকে পড়ছে৷ আর যখন সময় উল্টো দিকে চলবে, তখন ব্ল্যাকহোলই টাইম রিভার্সাল ভিডিওর মতো আচরণ করবে। আমরা দেখব একটা কালো গর্ত থেকে বস্তুকণা আর আলোকরশ্মি বেরিয়ে আসছে।

আরও পড়ুন
হোয়াইট হোলকে হালে জনপ্রিয় করে তুলেছেন ইতালিয়ান তাত্ত্বিক পদার্থবিদ ও ফ্রান্সের সেন্টার দে ফিজিক থিওরিক-এর গবেষক কার্লো রোভেল্লি। তিনি হোয়াইট হোলস নামে আস্ত একটি বই লিখেছেন।

ঘূর্ণিপাকের মতো করে

আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের বড় সমস্যা হলো সময় শুধু সামনের দিকেই প্রবাহিত হয়, পেছনের দিকে নয়। কিন্তু কথাটা বড়দের জগতে সত্য হলেও কণাজগতে নয়। কোয়ান্টাম কণারা সময়ের পেছনের দিকেও চলতে পারে। এর পরীক্ষামূলক প্রমাণও আছে। কিন্তু হোয়াইট হোল তো কণা নয়, বিশাল ভরের এক দানব। তাহলে সে সময়ের উল্টো দিকে চলবে কী করে?

আসলে হোয়াইট হোলের আধুনিক তত্ত্বটা এখনো হাইপোথিসিস পর্যায়ে রয়েছে। আর এর প্রাথমিক ভাবনাটা কার্লো রোভেল্লির শিষ্য হ্যাল হ্যাগার্ডের মাথায় প্রথম আসে। তারপর গুরু–শিষ্য মিলে একটা গাণিতিক কাঠামো দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন। স্টিফেন হকিং যেমন ব্ল্যাকহোলকে বিকিরণের আয়নায় বাঁধতে চেয়েছিলেন গণিতের রশি ব্যবহার করে, অনেকটা সেভাবেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন রোভেল্লি আর হ্যাল জুটি।

আরও পড়ুন
আসলে হোয়াইট হোলের আধুনিক তত্ত্বটা এখনো হাইপোথিসিস পর্যায়ে রয়েছে। আর এর প্রাথমিক ভাবনাটা কার্লো রোভেল্লির শিষ্য হ্যাল হ্যাগার্ডের মাথায় প্রথম আসে।

কোয়ান্টাম প্রভাব

আগেই বলেছি, বড়দের জগতে সময় শুধু সামনের দিকেই যায়। হোয়াইট হোলের ক্ষেত্রে সময়কে পেছনের দিকে প্রবাহিত হতেই হবে। এটা তখনই সম্ভব, যদি ব্ল্যাকহোলে কোয়ান্টাম মেকানিকস প্রয়োগ করা সম্ভব হয়।

একটা ব্ল্যাকহোল দেখতে অনেকটা ফানেলের মতো। ফানেলের মুখটা ঘটনা দিগন্ত। আর ফানেলের সরু নলটার শেষ মাথায় হলো সিঙ্গুলারিটির অবস্থান। অর্থাৎ ভারী নক্ষত্র যখন নিজের ওপর কেন্দ্র বরাবর ভেঙে পড়ে, তখন এর ঘটনা দিগন্তের অনেক দূরে গিয়ে একটা বিন্দুতে জমা হয় সব ভরশক্তি। স্থান-কাল বেঁকে গিয়ে ঘটনা দিগন্ত ফানেলের মুখ ও সরু নলের মতো আকৃতি লাভ করে।

একটা ব্ল্যাকহোল দেখতে অনেকটা ফানেলের মতো
ছবি: সংগৃহীত

হ্যাল প্রস্তাব করেন, ফানেলের শেষ মাথাটা আসলে ব্ল্যাকহোলের স্থানিক কেন্দ্রে নয়, বরং রয়েছে ভবিষ্যতের কোনো বিন্দুতে। তাই এমনটাও ঘটা সম্ভব, সব ভরশক্তি ভবিষ্যতের সেই বিন্দুতে—যেটাকে আমরা সিঙ্গুলারিটি বলছি—সেখানে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই আবার বাউন্স করে সময়ের উল্টো দিকে চলে আসে। তাহলে পুরো ব্যাপারটা তখন সময়ের পেছন দিকে ঘটবে এবং ব্ল্যাকহোল পরিণত হবে হোয়াইট হোলে। অর্থাৎ ব্ল্যাকহোল পরিণত হবে হোয়াইট হোলে। আর বিজ্ঞানীরাও সিঙ্গুলারিটির হাত থেকে রক্ষা পাবেন।

কিন্তু ব্ল্যাকহোল যদি একটা বিন্দুতে পরিণত না হয়, তাহলে সেটা কোয়ান্টাম বলবিদ্যার দ্বারা প্রভাবিত হবে কীভাবে?

আরও পড়ুন
একটা ব্ল্যাকহোল দেখতে অনেকটা ফানেলের মতো। ফানেলের মুখটা ঘটনা দিগন্ত। আর ফানেলের সরু নলটার শেষ মাথায় হলো সিঙ্গুলারিটির অবস্থান।

এখানেই আসলে রোভেল্লির ক্যারিশমা কাজ করে। বহুদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা বলার চেষ্টা করছেন, কণাদের মতো স্থান-কালও কোয়ান্টায়িত। কোনো বস্তু তখন কোয়ান্টায়িত হয়, যখন সেটা দানাদার হয়। অর্থাৎ একটা নির্দিষ্ট আকারের পর সেই বস্তুকে আর ভাঙা যায় না। কোয়ার্ক, ইলেকট্রনের মতো মূল কণাদের তাই আর ভাঙা যায় না। আবার আলো বা তাপশক্তির মতো তরঙ্গগুলোরও আসলে দানাদার সত্তা রয়েছে। একটা নির্দিষ্ট প্যাকেটের মধ্যে শক্তি কোয়ান্টায়িত হয়ে থাকে। সেই প্যাকেটকে বলে ফোটন।

তেমনি স্থান–কালেরও একটি ক্ষুদ্র দানাদার সত্তা আছে। স্থান–কালকে এর চেয়ে সংকুচিত করা যায় না। আসলে কোনো বস্তুর ব্যাসার্ধ প্ল্যাঙ্ক দৈর্ঘ্যের (1.616×10⁻³⁵ মিটার) চেয়ে ছোট হতে পারে না। তাই হোলের সংকুচিত ভরশক্তির ব্যাসও এর চেয়ে ছোট হবে না। তবে এর চেয়ে বড় হলেও কোয়ান্টাম প্রভাব কাজ করে। যেমন কাজ করে প্ল্যাঙ্ক দৈর্ঘ্যের চেয়ে আকারে বড় ইলেকট্রন কিংবা কোয়ার্কের ক্ষেত্রে। এ ব্যাপারই হোয়াইট হোলকে বাঁচিয়ে দেয় সিঙ্গুলারিটির হাত থেকে।

ব্ল্যাকহোলের ভরশক্তি একটা অসীম ঘনত্বের বিন্দুতে পরিণত হওয়ার আগেই বাউন্স ব্যাক করে সময়ের উল্টো দিকে। আর এই বাউন্স করতে সে কাজে লাগায় কোয়ান্টাম লাফ। কোয়ান্টাম মেকানিকস বলে, কোনো একটা কোয়ান্টাম কণা কিছু অনুমোদিত নির্দিষ্ট শক্তিস্তরে থাকতে পারে। দুটি অনুমোদিত শক্তিস্তরের মাঝে অননুমোদিত অনেক জায়গা থাকে। সেসব জায়গায় কণারা থাকতে পারে না। তাই এক শক্তিস্তর থেকে আরেক শক্তিস্তরে যেতে হলে কণাদের কোয়ান্টাম লাফ দিতে হয়। মাঝের অননুমোদিত জায়গাগুলো এড়িয়ে তারা এক শক্তিস্তর থেকে আরেক শক্তিস্তরে চলে যায়।

আরও পড়ুন
ব্ল্যাকহোলের ভরশক্তি একটা অসীম ঘনত্বের বিন্দুতে পরিণত হওয়ার আগেই বাউন্স ব্যাক করে সময়ের উল্টো দিকে। আর এই বাউন্স করতে সে কাজে লাগায় কোয়ান্টাম লাফ।

ঠিক এভাবেই ব্ল্যাকহোলের ভেতরকার পুঞ্জীভূত কণারা লাফ দিয়ে বাউন্স ব্যাক করতে পারে। তবে সিঙ্গুলারিটির বাইরে তাদের অনুমোদিত জায়গায় বেরিয়ে আসা কঠিন। কিন্তু কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় অসম্ভব বলে কিছু নেই—হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি ও শ্রোডিঙ্গারের ওয়েভ ফাংশন তত্ত্ব থেকে বেরিয়ে আসা কিছু পরিঘটনা সেটা প্রমাণ করে।

কণাদের তরঙ্গ ফাংশন থাকে; অনুমোদিত শক্তিস্তরের বাইরেও তরঙ্গ ফাংশনের বিস্তার থাকার কিছুটা সম্ভাবনা থাকে। ক্ষীণ এই সম্ভাবনাও অনেক সময় বাস্তব হয়ে ওঠে। কণাদের সংখ্যা যখন কোটি কোটি হয়, তখন কিছুসংখ্যক কণা কোয়ান্টাম বাধা টপকে বাইরে চলে যায়। তাই একেবারে নিরেট একটা প্রতিবন্ধক তুললেও সব কণাকে আটকে ফেলা যায় না। টানেলিংয়ের সাহায্যে কিছু কণা ঠিকই বেরিয়ে আসে।

ব্ল্যাকহোলের ভেতরের পুঞ্জীভূত ভরশক্তিও এভাবে বারবার কোয়ান্টাম লাফ দিয়ে কয়েকবার অন্তত সফল হয়। তবে এ ক্ষেত্রে ব্ল্যাকহোলের স্থান–কাল উভয়ই এখানে কণাদের মতো আচরণ করে এবং কোয়ান্টাম লাফ দিয়ে উল্টো দিকে চলে যায়। পরিণত হয় হোয়াইট হোলে।

আরও পড়ুন
কণাদের সংখ্যা যখন কোটি কোটি হয়, তখন কিছুসংখ্যক কণা কোয়ান্টাম বাধা টপকে বাইরে চলে যায়। তাই একেবারে নিরেট একটা প্রতিবন্ধক তুললেও সব কণাকে আটকে ফেলা যায় না।

হোয়াইট হোল কি আদৌ আছে

হকিং বিকিরণের কারণে ব্ল্যাকহোলের ঘটনা দিগন্ত ক্রমেই ছোট হতে থাকে। কিন্তু ঘটনা দিগন্ত ছোট হওয়া মানেই কিন্তু এর ভেতরকার জায়গা কমে যাওয়া নয়। বরং ছোট ঘটনা দিগন্তের ভেতরে বিশাল স্থান–কাল নিয়েই বহাল তবিয়তে থাকে ব্ল্যাকহোল। তারপর সেই বড় স্থান–কাল কোয়ান্টাম লাফ দিয়ে শ্বেত গহ্বরে পরিণত হতে পারে। কিন্তু এত কিছুর পরও তাহলে শ্বেত গহ্বরকে আমরা খুঁজে পাচ্ছি না কেন?

এর মূল কারণ, স্থান-কালের একটা ভুল কনসেপ্ট আমাদের মনে গেঁথে আছে। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়েও আমাদের ধারণা স্পষ্ট নয়। সময় যে উল্টো দিকে প্রবাহিত হতে পারে আমাদের বাস্তব জগতেই, সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান দিয়ে সেটা বোঝা অসম্ভব।

এ বিষয়ে একটা দারুণ উদাহরণ দিয়েছেন কার্লো রোভেল্লি তাঁর ‘হোয়াইট হোলস’ বইয়ে। ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় অতীত ও বর্তমানকে আলাদা করে বোঝার ক্ষমতা নেই আমাদের।

রোভেল্লি একটি পানির ট্যাংকের উদাহরণ দিয়েছেন। বলেছেন, পানির ট্যাংকের মাঝখানটা একটা পানিরোধক ব্ল্যাকহেড দিয়ে আলাদা করা। ব্ল্যাকহেড সরিয়ে দিয়ে ট্যাংকে পানি ঢালুন। ট্যাংকের সব দিকে পানির উচ্চতা সমান। পানি দেখে স্থিতিশীল মনে হবে। এ অবস্থায় ট্যাংকের পানির দিকে ক্যামেরা তাক করে ভিডিও করুন। তারপর সেই ভিডিও রিভার্স মোডে চালু করে দেখুন, স্বাভাবিক মোড আর রিভার্স মোডের মধ্যে কোনো পার্থক্যই পাবেন না।

মহাবিশ্ব যদি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় থাকে, তাহলে সময়ের সামনে চলা আর পেছনে চলার মধ্যে কোনো পার্থক্যই পাবেন না আপনি।

আরও পড়ুন
পানির ট্যাংকের মাঝখানটা একটা পানিরোধক ব্ল্যাকহেড দিয়ে আলাদা করা। ব্ল্যাকহেড সরিয়ে দিয়ে ট্যাংকে পানি ঢালুন। ট্যাংকের সব দিকে পানির উচ্চতা সমান। পানি দেখে স্থিতিশীল মনে হবে।

এবার ব্ল্যাকহেডটা দিয়ে ট্যাংকের দুই পাশ আলাদা করে ফেলুন। পানি ঢালুন ট্যাংকের এক পাশে। আরেক পাশে পুরোপুরি ফাঁকা রাখুন। একদিকে পানির উচ্চতা অনেক বেশি, আরেক দিকে পানি একদম নেই। এবার ব্ল্যাকহেড খুলে দিন। পানি ধীরে ধীরে ট্যাংকের ভরা অঞ্চল থেকে খালি অঞ্চলের দিকে ধাবিত হবে। একসময় পুরো ট্যাংকে পানির স্তর সমান হলে পানির প্রবাহ বন্ধ হবে, ট্যাংক এসে যাবে ভারসাম্যে। ব্ল্যাকহেড খোলার পর পানি ভারসাম্যে আসার আগপর্যন্ত মাঝের সময়টিকে ভিডিও করুন। তারপর স্বাভাবিক ও রিভার্স মোডে চালিয়ে দেখুন, স্পষ্ট পার্থক্য দেখতে পাবেন।

রোভেল্লি বলেছেন, মহাবিশ্ব যখন ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় থাকে, তখন অতীত আর ভবিষ্যতের মধ্যে পার্থক্য করা মুশকিল—ট্যাংকের পানির মতোই। সময়ে বিপরীতমুখী প্রবাহ তাই বোঝা একেবারে অসম্ভব। আমাদের মহাবিশ্ব এখন এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ের মধ্যে যাচ্ছে, যার শুরুটা হয়েছিল বিগ ব্যাংয়ের মাধ্যমে। তাই এখন সময়ের ভবিষ্যৎ আর অতীতের মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। এনট্রপির বেড়ে চলা সময়কে সামনের দিকেই এগিয়ে নিচ্ছে, পেছন দিকে চলতে বাধা দিচ্ছে। কিন্তু কোয়ান্টাম লেভেলে সময় পেছন দিকেও চলতে পারে। কিন্তু সেই জগতে সময়ের ভারসাম্য রয়েছে। তাই অতীত ও ভবিষ্যতের পার্থক্য করা মুশকিল।

কোয়ান্টাম প্রক্রিয়া দ্বারা প্রভাবিত একটা ব্ল্যাকহোল সময়ের পেছন দিকে প্রবাহিত হলেও সেটাকে সাধারণ একটা ব্ল্যাকহোলের সঙ্গে পার্থক্য করা মুশকিল।

আরও পড়ুন
রোভেল্লি বলেছেন, মহাবিশ্ব যখন ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় থাকে, তখন অতীত আর ভবিষ্যতের মধ্যে পার্থক্য করা মুশকিল—ট্যাংকের পানির মতো। সময়ে বিপরীতমুখী প্রবাহ তাই বোঝা একেবারে অসম্ভব।

আরেকটা বড় সমস্যা হলো, সময়ের ধীর হয়ে যাওয়া। কোনো নভোচারী যদি ব্ল্যাকহোলের ঘটনা দিগন্তের দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন, আমরা দেখব তিনি যত এগোচ্ছেন, সময় তত ধীর হচ্ছে। ঘটনা দিগন্তের রেখায় পৌঁছে গেলে সময় অত্যন্ত ধীর হয়ে যাবে। সেখানকার এক সেকেন্ড আমাদের কাছে এক কোটি বছরের সমান হয়ে যাবে। তাই নভোচারীকে তো বটেই, আমাদের কয়েক প্রজন্মও দেখবে নভোচারী ঘটনা দিগন্তের রেখায় গিয়ে জমে গিয়েছেন। তারপর হয়তো এক কোটি বছরের পরের প্রজন্ম দেখবে একজন নভোচারীকে ব্ল্যাকহোলের ঘটনা দিগন্ত পেরিয়ে যেতে।

হোয়াইট হোলের ভেতর থেকে ঘটনা দিগন্ত থেকে বেরিয়ে আসা কোনো বস্তুকে দেখতে হলে কোটি কোটি বছর অপেক্ষা করতে হবে
ছবি: সংগৃহীত

তেমনি হোয়াইট হোলের ঘটনা দিগন্তের কাছেও সময় আমাদের জন্য খুব ধীরে চলবে। তাই হোয়াইট হোলের ভেতর থেকে ঘটনা দিগন্ত থেকে বেরিয়ে আসা কোনো বস্তুকে দেখতে হলে কোটি কোটি বছর অপেক্ষা করতে হবে। ঠিক এ কারণেই আমরা এখন কোনো হোয়াইট হোল যদি শনাক্তও করতে পারি, সেটাকে ব্ল্যাকহোল ভেবে ভুল করার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ।

আরও পড়ুন
কোনো নভোচারী যদি ব্ল্যাকহোলের ঘটনা দিগন্তের দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন, আমরা দেখব তিনি যত এগোচ্ছেন, সময় তত ধীর হচ্ছে। ঘটনা দিগন্তের রেখায় পৌঁছে গেলে সময় অত্যন্ত ধীর হয়ে যাবে।

তাই হোয়াইট হোলের তত্ত্বকে যেমন উড়িয়ে দিতে পারবেন না, তেমনি এটার অস্তিত্ব আছে—এটার প্রমাণও দেওয়া সম্ভব নয়। রোভেল্লি মনে করেন, হোয়াইট হোল নিয়ে তাঁরা যে তত্ত্বটা গড়ে তুলেছেন, সেটা একদম খাঁটি। ব্ল্যাকহোল প্রথম শনাক্ত করার বহু আগেই যেমন এর তাত্ত্বিক ও গাণিতিক কাঠামো ছিল, হোয়াইট হোলের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাদের হাতে তত্ত্ব আছে, সুন্দর গাণিতিক কাঠামো আছে, কিন্তু পরীক্ষামূলক প্রমাণ নেই।

কত দিনে মহাবিশ্বের সবচেয়ে উজ্জ্বল বস্তুটির সন্ধান মিলবে, সে কথা এখনই কেউ জোর দিয়ে বলতে পারেন না।

লেখক: সাংবাদিক

সূত্র: ১. হোয়াইট হোলস: হোয়াট উই নো অ্যাবাউট ব্ল্যাকহোলস নেগলেটেড টুইনস/চার্লি উড/অল অ্যাবাউট স্পেস ১১ জুলাই ২০২৩

২. হোয়াইট হোলস /কার্লো রোভেল্লি/ অনুবাদ: আবুল বাসার

*লেখাটি ২০২৫ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় নভেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত 

আইনস্টাইনের বিখ্যাত সমীকরণ E=mc2 এর মানে কি?

‎জার্মান পদার্থবিদ আলবার্ট আইনস্টাইনের বিখ্যাত সমীকরণ E=mc2 এর মানে কি? ‎ ‎যদি প্রশ্ন করা হয়, বিজ্ঞানের তথা পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে নামকরা সম...