মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬

হোয়াইট হোল কি সত্যিই আছে

হোয়াইট হোল কি সত্যিই আছে

বর্তমানে ব্ল্যাকহোলের মতোই বহুল আলোচিত মহাজাগতিক বস্তু হোয়াইট হোলস। কিন্তু ব্ল্যাকহোলের পরীক্ষামূলক প্রমাণ থাকলেও হোয়াইট হোলের তেমন কোনো প্রমাণ এখনো মেলেনি। গাণিতিকভাবে বাস্তব জগতে সময়ের উল্টো দিকে প্রবাহ সম্ভব নয় বলে হোয়াইট হোলের অস্তিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ। হোয়াইট হোলস কি তবে বাস্তবে থাকা সম্ভব?

ব্ল্যাকহোল বনাম হোয়াইট হোল

জুতা সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ—নিউটনের তৃতীয় সূত্র ব্যবহার হচ্ছে যত্রতত্র। প্রয়োজন থাকুক আর না থাকুক—উল্টো কিছু দেখলেই আমরা বলি, প্রত্যেক ক্রিয়ারই বিপরীত ক্রিয়া আছে। ব্ল্যাকহোলেও কি তা–ই? ব্ল্যাকহোলের মেকানিজমে নিউটনের তৃতীয় সূত্রের কতটুকু উপযোগিতা আছে, সে নিয়ে তর্ক হতে পারে। কিন্তু ওই প্রবাদ অর্থে প্রশ্ন হতেই পারে, যদি ব্ল্যাকহোল সবকিছু গ্রাস করে নেয়, তাহলে কি এমন কিছু আছে, যা কিছুই শোষণ করে না, বরং সবকিছু ফিরিয়ে দেয়?

এমন কোনো জিনিসের প্রমাণ নেই, তবে তাত্ত্বিকভাবে আছে হোয়াইট হোল নামের এক মহাবৈশ্বিক দানব। ব্ল্যাকহোলের সম্পূর্ণ উল্টো চরিত্র। ব্ল্যাকহোল সবকিছু গ্রাস করে নেয় বলে সেটা সম্পূর্ণ কালো। অন্যদিকে হোয়াইট হোল কিছুই শোষণ করে না, বরং ভেতর থেকে সবকিছু বের করে দেয়। তাই মহাবিশ্বের সবচেয়ে উজ্জ্বল বস্তু এই হোয়াইট হোল। অথচ সেটাই এখনো দেখতে পারছি না। ব্যাপারটা অদ্ভুত না!

ব্ল্যাকহোল সবকিছু গ্রাস করে নেয় বলে সেটা সম্পূর্ণ কালো
ছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

ধরা যাক, আপনার একটি প্রবল গতির মহাকাশযান আছে। সেটিতে চড়ে আপনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন মহাকাশের অলিগলিতে। ছুটছেন তো ছুটছেন। কত গ্রহ-নক্ষত্রকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন, কত গ্যালাক্সি দেখতে পাচ্ছেন দূর থেকে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের মতো। হঠাৎ মহাকাশের এক অন্ধকার কোণে চোখে পড়ল একটি আলোর বৃত্ত। তার ঠিক মাঝখানটা ভয়ানক কালো। কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। আপনার যদি যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক জ্ঞান থাকে, তাহলে সহজেই বুঝতে পারবেন, আলোর বৃত্তটার ঠিক মাঝখানে রয়েছে একটি ব্ল্যাকহোল।

আরও পড়ুন
ব্ল্যাকহোল সবকিছু গ্রাস করে নেয় বলে সেটা সম্পূর্ণ কালো। অন্যদিকে হোয়াইট হোল কিছুই শোষণ করে না, বরং ভেতর থেকে সবকিছু বের করে দেয়। তাই মহাবিশ্বের সবচেয়ে উজ্জ্বল বস্তু হোয়াইট হোল।

আরও নির্দিষ্ট করে বলা যায়, মাঝখানের কালো অংশ আসলে ব্ল্যাকহোলের মুখ। বৈজ্ঞানিক ভাষায় সেটাকে বলা হয় ‘ইভেন্ট হরাইজন’ বা ঘটনা দিগন্ত। ঘটনা দিগন্ত আসলে আমাদের চিরচেনা জগতের বর্ডারলাইন। সেই লাইন পার হলেন তো পড়ে গেলেন ব্ল্যাকহোলের অন্ধকূপে। সেখান থেকে ফিরে আসার কোনো পথ নেই। ব্ল্যাকহোলের সীমারেখা পার হলে সব বস্তুই ব্ল্যাকহোলের প্রবল মহাকর্ষীয় টানে ভেতরে গিয়ে পড়ে। সেখান থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই।

কিন্তু এবার একটু অ্যাডভান্স হোন, বিজ্ঞানের আধুনিক তত্ত্বগুলোর খুঁটিনাটি তালাশ করুন। তারপর চলে যান মহাকাশ ভ্রমণে। এবারও আপনার চোখে পড়ল এমন কোনো উজ্জ্বল বৃত্ত, যার ভেতরটা ঘুটঘুটে কালো। এবার কি আপনি নিশ্চিত করে বলতে পারবেন, যেটা দেখছেন, সেটা ব্ল্যাকহোল?

হোয়াইট হোলেরও ইভেন্ট হরাইজন আছে। তার চার পাশে আছে উজ্জ্বল আলোকবলয়
ছবি: গেটি ইমেজ

না, তা পারবেন না। কারণ, আপনি এখন ভালো করেই জানেন, ব্ল্যাকহোল আর হোয়াইট হোল খোলা চোখে দেখতে একই রকম। দূর থেকে দেখে পার্থক্য বোঝা মুশকিল।

কিন্তু কেন এমন হলো? সম্পূর্ণ উল্টো চরিত্রের হওয়ার পরও কেন তাদের চেহারা একই রকম?

ব্ল্যাকহোলের যেমন ভর, ঘূর্ণন বা স্পিন আছে, হোয়াইট হোলেরও তেমনি ভর ও ঘূর্ণন আছে। হোয়াইট হোলেরও ইভেন্ট হরাইজন আছে। তার চার পাশে আছে উজ্জ্বল আলোকবলয়। তাই খোলা চোখে দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য খুঁজে বের করা মুশকিল। কিন্তু মূল পার্থক্যের জায়গা হলো ওই ইভেন্ট হরাইজন। ব্ল্যাকহোলের ইভেন্ট হরাইজন সবকিছু শোষণ করে নেয়, কিছুই ফিরিয়ে দেয় না, এমনকি আলোর মতো ভরহীন শক্তিও এর ভেতরে একবার ঢুকে পড়লে আর বেরিয়ে আসতে পারে না।

আরও পড়ুন
ব্ল্যাকহোলের যেমন ভর, ঘূর্ণন বা স্পিন আছে, হোয়াইট হোলেরও তেমনি ভর ও ঘূর্ণন আছে। হোয়াইট হোলেরও ইভেন্ট হরাইজন আছে। তার চার পাশে আছে উজ্জ্বল আলোকবলয়।

অন্যদিকে হোয়াইট হোলের ইভেন্ট হরাইজন কোনো কিছুই শোষণ করে না, বরং হোয়াইট হোলের ভেতরকার সব পদার্থ ইভেন্ট হরাইজনের বাইরে বেরিয়ে এসে একটা উজ্জ্বল বলয় তৈরি করে। এমনকি আপনি যদি বাইরে থেকে কোনো বস্তু হোয়াইট হোলের ভেতর নিক্ষেপ করেন, সেটা ভেতরে ঢুকবে না, আপনি নিজেও হোয়াইট হোলের কাছে গিয়ে ইভেন্ট হরাইজনের বর্ডারলাইন পেরোতে পারবেন না কিছুতেই। বরং এক প্রবল বিকর্ষণ বল আপনাকে সেখান থেকে ছুড়ে বাইরে নিক্ষেপ করবে। এরপরও ইভেন্ট হরাইজনের মাঝখানটা ঠিকই ঘুটঘুটে অন্ধকার। আর সে কারণেই ব্ল্যাকহোল আর হোয়াইট হোলের বাহ্যিক চেহারায় কোনো পার্থক্য নেই।

হোয়াইট হোল কিছুই শোষণ করে না, অথচ নিজের ভেতর থেকে ক্রমাগত ভর-শক্তি উগরে দেয়। এত ভর তাহলে সে কোথায় পায়?

হোয়াইট হোলের ভেতরকার সব পদার্থ ইভেন্ট হরাইজনের বাইরে বেরিয়ে এসে একটা উজ্জ্বল বলয় তৈরি করে
ছবি: উইকিমিডিয়া ক্রিয়েটিভ কমন্স

উত্তর খুব সোজা, ব্ল্যাকহোলের কাছ থেকে ভরের জোগান পায় হোয়াইট হোল। ব্ল্যাকহোল যা কিছু শোষণ করে ইভেন্ট হরাইজনের মুখ দিয়ে, সেটাই ক্রমাগত বাইরে বের করে দেয় আরেকটা মুখ দিয়ে। অর্থাৎ ব্ল্যাকহোলের ভেতরে ঢোকা ভর-শক্তিগুলোই হোয়াইট হোল থেকে বেরিয়ে আসে।

তাহলে কি ব্ল্যাকহোলের উল্টো পিঠে আরেক দরজা আছে, যেটা দিয়ে সবকিছু বেরিয়ে আসে?

ব্যাপার অনেকটা সে রকম। কিন্তু উল্টো পিঠ বলতে আমরা সাধারণত স্থানের উল্টো পিঠ বুঝি। যেমন একটা টানেলের ওপাশে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য আরেকটা মুখ থাকে। কিন্তু হোয়াইট হোল ঠিক টানেলের উল্টো পাশের মুখ নয়। এটা বরং সময়ের উল্টো দিকে থাকা আরেকটা মুখ।

আরও পড়ুন
ব্ল্যাকহোল যা কিছু শোষণ করে ইভেন্ট হরাইজনের মুখ দিয়ে, সেটাই ক্রমাগত বাইরে বের করে দেয় আরেকটা মুখ দিয়ে। অর্থাৎ এর ভেতরে ঢোকা ভর-শক্তিগুলোই হোয়াইট হোল থেকে বেরিয়ে আসে।

সিঙ্গুলারিটির মৃত্যু!

তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীদের বড় ভয় সিঙ্গুলারিটি নিয়ে। সিঙ্গুলারিটি হলো অসীম ঘনত্বের একটা বিন্দু। অনেকে এটাকে পরম বিন্দুও বলেন। ব্ল্যাকহোলের আধুনিক ধারণাটা এসেছিল ১৯১৬ সালে। জার্মান বিজ্ঞানী কার্ল শোয়ার্জশিল্ড যুদ্ধক্ষেত্রে জীবনঘাতী অসুখের সঙ্গে লড়তে লড়তে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার একটা গাণিতিক সমাধান বের করেন। সেই সমাধানে তিনি দেখান, কোনো ব্ল্যাকহোল যদি যথেষ্ট ভারী হয়, তাহলে সেটা তার চারপাশের স্থান-কালকে অসীমভাবে বাঁকিয়ে দেবে। সেই বক্র স্থান-কালের ভেতর কোনো বস্তু, এমনকি আলোও একবার ঢুকলে আর বেরিয়ে আসতে পারবে না। শোয়ার্জশিল্ডের সেই তত্ত্ব বহুদিন তত্ত্ব হিসেবেই রয়ে যায়।

১৯৩০-এর দশকে সুব্রাহ্মনিয়ান চন্দ্রশেখর ও রবার্ট ওপেনহাইমারের গবেষণা শোয়ার্জশিল্ডের তত্ত্বে সরাসরি প্রভাব না ফেললেও অক্সিজেনটা সরবরাহ করে যায় টিকিয়ে রাখার জন্য। তারপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল, কণাপদার্থবিজ্ঞানের মহা মহা সব গবেষণায় মহাকাশবিদ্যা কিছুটা পথ হারিয়ে ফেলে, ব্ল্যাকহোল তত্ত্বও তাই চাপা পড়ে থাকে অন্ধকূপে। ১৯৬০-এর দশকে মার্কিন জন হুইলার আবার বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি মহাবিশ্বের দিকে ফেরাতে সক্ষম হন। তিনিই শোয়ার্জশিল্ডের সেই আলোখেকো বস্তুটার নাম দেন।

শিল্পীর কল্পনায় একটি কৃষ্ণগহ্বরের ছবি। কৃষ্ণগহ্বরের কেন্দ্র সিঙ্গুলারিটি বা পরম বিন্দুর উদাহরণ
ছবি: সংগৃহীত

১৯৬০ সালে গণিতবিদ মার্টিন ডেভিড ক্রাসকাল শোয়ার্জশিল্ডের ব্ল্যাকহোল নিয়ে কিছু কাজ করেছিলেন। তিনি শোয়ার্জশিল্ডের তত্ত্বটা নিজে করেন। স্থান ও কালের তত্ত্বটার বিকল্প একটা সমাধান বের করেন তিনি। তাতে দেখা যায়, ব্ল্যাকহোলে মিরর ইমেজ বা উল্টো প্রতিবিম্ব থাকা সম্ভব। তবে নতুন এ কাঠামোর গুরুত্ব বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলেন ক্রাসকাল। আসলে তিনি আধুনিক হোয়াইট হোলের একটা গাণিতিক প্রতিরূপ তৈরি করে ফেলেছিলেন নিজের অজান্তে।

আরও পড়ুন
১৯৩০-এর দশকে সুব্রাহ্মনিয়ান চন্দ্রশেখর ও রবার্ট ওপেনহাইমারের গবেষণা শোয়ার্জশিল্ডের তত্ত্বে সরাসরি প্রভাব না ফেললেও অক্সিজেনটা সরবরাহ করে যায় টিকিয়ে রাখার জন্য।

পরে ১৯৬৫ সালে পেনরোজ একটি গাণিতিক তত্ত্ব দাঁড় করান। সেই তত্ত্বে তিনি দেখান, কোনো নক্ষত্রকে যদি ব্ল্যাকহোলে পরিণত হতে হয়, তাহলে সেই নক্ষত্রকে নিজের কেন্দ্র বরাবর ভেঙে পড়তে হবে। নক্ষত্রটির সব ভর গিয়ে জড়ো হবে একটা বিন্দুতে। সেই বিন্দু হবে আয়তনহীন। তাই তার ভর ও ঘনত্ব হবে অসীম। অসীম ঘনত্বের এ ভরকেই সিঙ্গুলারিটি বলে অভিহিত করেন পেনরোজ। পরে স্টিফেন হকিং দেখান, আমাদের মহাবিশ্বের জন্মও হয়েছিল অসীম ঘনত্বের একটা সিঙ্গুলারিটি থেকে। সেই বিন্দুই বিগ ব্যাংয়ের মাধ্যমে স্থান-কালে প্রসারিত হয়ে মহাবিশ্বের জন্ম দিয়েছে।

কিন্তু আধুনিক বিগ ব্যাং থিওরি ইনফ্লেশন থিওরিকে বেশি সমর্থন করে। আর ইনফ্লেশনারি বিগ ব্যাং থিওরিতে সিঙ্গুলারিটির দরকার হয় না। সত্যি বলতে কি, পদার্থবিজ্ঞানীরা সিঙ্গুলারিটিকে ভয় পান। কারণ, এই বিন্দুতে গিয়ে পদার্থবিজ্ঞানের সব তত্ত্ব অকেজো হয়ে পড়ে। সুতরাং সিঙ্গুলারিটি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীদের এগিয়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ করে দেয়। তাই তাঁরা এটাকে পারতপক্ষে এড়িয়ে চলার চেষ্টাই করেন। ইনফ্লেশন থিওরি কসমোলজিকে সিঙ্গুলারিটি থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ব্ল্যাকহোলে সিঙ্গুলারিটি আছে বহাল তবিয়তে। বিজ্ঞানীরা ব্ল্যাকহোলের ভেতরের খবর জানতে চান। সেটার জন্য মূল বাধা সিঙ্গুলারিটি। আর এ বাধা টপকাতে কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে সিঙ্গুলারিটির মৃত্যু।

আরও পড়ুন
সিঙ্গুলারিটি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীদের এগিয়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ করে দেয়। তাই তাঁরা এটাকে পারতপক্ষে এড়িয়ে চলার চেষ্টাই করেন। ইনফ্লেশন থিওরি কসমোলজিকে সিঙ্গুলারিটি থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।

প্যারালাল ইউনিভার্সের সঙ্গে সংযোগ

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সময় উল্টো দিকে চলে না। কিন্তু যদি অন্য কোনো প্যারালাল ইউনিভার্স থাকে, সেখানে হয়তো সময় চলে আমাদের বিপরীত দিকে। ব্ল্যাকহোলের মুখ আমাদের মহাবিশ্বে আর হোয়াইট হোলের মুখ থাকতে পারে সেই সমান্তরাল মহাবিশ্বে। সে ক্ষেত্রে ব্ল্যাকহোল আর হোয়াইট হোলের মধ্যে একটা সংযোগ দরকার। সেই সংযোগ হতে পারে কোয়ান্টাম টানেলিংয়ের মাধ্যমে। নিজের ছাত্র হ্যাল হ্যাগার্ডের এই অনুমানকেও উড়িয়ে দেননি রোভেল্লি। হ্যালের এই ধারণা যদি সত্যি হয়, তাহলে আমাদের মহাবিশ্বে যে হোয়াইট হোলের দেখা পাচ্ছি না, তার একটা কারণ অন্তত পাওয়া গেল।

একই রকম ব্যাপার ধরা হয় অ্যান্টিম্যাটার বা প্রতিপদার্থের ক্ষেত্রেও। অ্যান্টিম্যাটার কণাদের এমনি মহাবিশ্বে পাওয়া যায় না। নোবেলজয়ী মার্কিন পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যান রীতিমতো প্রমাণ করে দেখিয়েছিলেন, কণারা সময়ের বিপরীত দিকে চলতে পারে। এ সময় কণারা তার যমজ প্রতিকণার সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে আবার সময়ের সামনের দিকে অগ্রসর হয়। আর এসব প্রতিকণার জন্ম হয় কোয়ান্টাম ফ্ল্যাকচুয়েশন নামের বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

ধারণা করা হয়, এসব প্রতিকণার বাস প্যারালাল ইউনিভার্সে। বিশেষ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে যদি প্রতিকণাদের আমাদের মহাবিশ্বে ডেকে আনা হয়, তখন প্রতিকণার যমজ স্বাভাবিক বস্তুকণাটি চলে যায় প্যারালাল ইউনিভার্সে।

হোয়াইট হোলের মুখ যদি প্যারালাল ইউনিভার্সেই থাকে, তাহলে সেটাকে কি আমাদের মহাবিশ্বে পাওয়া সম্ভব? তবে এ ধারণাও হয়তো অতিকল্পনা। তবু এটাকে একটা যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করাই যায়।

আরও পড়ুন
অ্যান্টিম্যাটার কণাদের এমনি মহাবিশ্বে পাওয়া যায় না। নোবেলজয়ী মার্কিন পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যান রীতিমতো প্রমাণ করে দেখিয়েছিলেন, কণারা সময়ের বিপরীত দিকে চলতে পারে।

সময়ের উল্টো পথে

একসময় কসমোলজিস্টরা ধারণা করতেন, সিঙ্গুলারিটির আগল ভাঙা ব্ল্যাকহোলের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু আধুনিক হোয়াইট হোল তত্ত্ব বোধ হয় সিঙ্গুলারিটির হাত থেকে পদার্থবিজ্ঞানকে মুক্ত করতে চলেছে (আদৌ যদি হোয়াইট হোলের দেখা মেলে)! হোয়াইট হোলকে হালে জনপ্রিয় করে তুলেছেন ইতালিয়ান তাত্ত্বিক পদার্থবিদ ও ফ্রান্সের ‘সেন্টার দে ফিজিক থিওরিক’-এর গবেষক কার্লো রোভেল্লি। তিনি হোয়াইট হোলস নামে আস্ত একটি বই লিখেছেন। তাতে দেখিয়েছেন, ব্ল্যাকহোলের সিঙ্গুলারাটিতে পৌঁছানের আগেই বস্তুকণাগুলো বাউন্স করে সময়ের উল্টো দিকে গিয়ে হোয়াইট হোলে রূপ নেয়। অর্থাৎ হোয়াইট হোল আসলে ব্ল্যাকহোলেরই টাইম রিভার্সাল রূপ। টাইম রিভার্সাল ব্যাপারটা এ যুগে বোঝা খুব সহজ।

আপনার স্মার্টফোনটি নিয়ে একটি ছোট্ট গর্তের কাছে যান। সঙ্গে নিয়ে যান আপনার কয়েকজন বন্ধুকে। তাদের হাতে কয়েক শ মার্বেল দিয়ে বলুন চারদিক থেকে সেগুলো গড়িয়ে গর্তের ভেতর ফেলতে। মার্বেলগুলো যখন গর্তের ভেতর পড়ছে, আপনি তখন গর্তের মুখের ভিডিও করুন। এক মিনিটের ভিডিওই যথেষ্ট। ভিডিওটি ঠিকঠাকমতো চালিয়ে দেখুন সেটা ঠিকমতো হয়েছে কি না। এবার ভিডিওটি উল্টো দিকে, অর্থাৎ পেছনের দিকে চালান। এখানে ভিডিওটির সবশেষ ফ্রেমটা সবার আগে দেখাবে এবং প্রথম ফ্রেমটা দেখাবে সবার শেষে। উল্টো ভিডিওতে আপনি কী দেখলেন? গর্তের মুখ থেকে মার্বেলগুলো বেরিয়ে আসছে!

আবার আপনি ভিডিওটি স্বাভাবিক মোডে চালান, দেখবেন একগুচ্ছ মার্বেল চারপাশ থেকে গিয়ে গর্তে পড়ছে। ব্ল্যাকহোল আর হোয়াইট হোলের ব্যাপারটাও এ রকম। সময় যখন সামনের দিকে চলছে, বস্তুকণা আর আলো ঘূর্ণিপাকের মতো করে ব্ল্যাকহোলের ঘটনা দিগন্তের ভেতর ঢুকে পড়ছে৷ আর যখন সময় উল্টো দিকে চলবে, তখন ব্ল্যাকহোলই টাইম রিভার্সাল ভিডিওর মতো আচরণ করবে। আমরা দেখব একটা কালো গর্ত থেকে বস্তুকণা আর আলোকরশ্মি বেরিয়ে আসছে।

আরও পড়ুন
হোয়াইট হোলকে হালে জনপ্রিয় করে তুলেছেন ইতালিয়ান তাত্ত্বিক পদার্থবিদ ও ফ্রান্সের সেন্টার দে ফিজিক থিওরিক-এর গবেষক কার্লো রোভেল্লি। তিনি হোয়াইট হোলস নামে আস্ত একটি বই লিখেছেন।

ঘূর্ণিপাকের মতো করে

আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের বড় সমস্যা হলো সময় শুধু সামনের দিকেই প্রবাহিত হয়, পেছনের দিকে নয়। কিন্তু কথাটা বড়দের জগতে সত্য হলেও কণাজগতে নয়। কোয়ান্টাম কণারা সময়ের পেছনের দিকেও চলতে পারে। এর পরীক্ষামূলক প্রমাণও আছে। কিন্তু হোয়াইট হোল তো কণা নয়, বিশাল ভরের এক দানব। তাহলে সে সময়ের উল্টো দিকে চলবে কী করে?

আসলে হোয়াইট হোলের আধুনিক তত্ত্বটা এখনো হাইপোথিসিস পর্যায়ে রয়েছে। আর এর প্রাথমিক ভাবনাটা কার্লো রোভেল্লির শিষ্য হ্যাল হ্যাগার্ডের মাথায় প্রথম আসে। তারপর গুরু–শিষ্য মিলে একটা গাণিতিক কাঠামো দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন। স্টিফেন হকিং যেমন ব্ল্যাকহোলকে বিকিরণের আয়নায় বাঁধতে চেয়েছিলেন গণিতের রশি ব্যবহার করে, অনেকটা সেভাবেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন রোভেল্লি আর হ্যাল জুটি।

আরও পড়ুন
আসলে হোয়াইট হোলের আধুনিক তত্ত্বটা এখনো হাইপোথিসিস পর্যায়ে রয়েছে। আর এর প্রাথমিক ভাবনাটা কার্লো রোভেল্লির শিষ্য হ্যাল হ্যাগার্ডের মাথায় প্রথম আসে।

কোয়ান্টাম প্রভাব

আগেই বলেছি, বড়দের জগতে সময় শুধু সামনের দিকেই যায়। হোয়াইট হোলের ক্ষেত্রে সময়কে পেছনের দিকে প্রবাহিত হতেই হবে। এটা তখনই সম্ভব, যদি ব্ল্যাকহোলে কোয়ান্টাম মেকানিকস প্রয়োগ করা সম্ভব হয়।

একটা ব্ল্যাকহোল দেখতে অনেকটা ফানেলের মতো। ফানেলের মুখটা ঘটনা দিগন্ত। আর ফানেলের সরু নলটার শেষ মাথায় হলো সিঙ্গুলারিটির অবস্থান। অর্থাৎ ভারী নক্ষত্র যখন নিজের ওপর কেন্দ্র বরাবর ভেঙে পড়ে, তখন এর ঘটনা দিগন্তের অনেক দূরে গিয়ে একটা বিন্দুতে জমা হয় সব ভরশক্তি। স্থান-কাল বেঁকে গিয়ে ঘটনা দিগন্ত ফানেলের মুখ ও সরু নলের মতো আকৃতি লাভ করে।

একটা ব্ল্যাকহোল দেখতে অনেকটা ফানেলের মতো
ছবি: সংগৃহীত

হ্যাল প্রস্তাব করেন, ফানেলের শেষ মাথাটা আসলে ব্ল্যাকহোলের স্থানিক কেন্দ্রে নয়, বরং রয়েছে ভবিষ্যতের কোনো বিন্দুতে। তাই এমনটাও ঘটা সম্ভব, সব ভরশক্তি ভবিষ্যতের সেই বিন্দুতে—যেটাকে আমরা সিঙ্গুলারিটি বলছি—সেখানে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই আবার বাউন্স করে সময়ের উল্টো দিকে চলে আসে। তাহলে পুরো ব্যাপারটা তখন সময়ের পেছন দিকে ঘটবে এবং ব্ল্যাকহোল পরিণত হবে হোয়াইট হোলে। অর্থাৎ ব্ল্যাকহোল পরিণত হবে হোয়াইট হোলে। আর বিজ্ঞানীরাও সিঙ্গুলারিটির হাত থেকে রক্ষা পাবেন।

কিন্তু ব্ল্যাকহোল যদি একটা বিন্দুতে পরিণত না হয়, তাহলে সেটা কোয়ান্টাম বলবিদ্যার দ্বারা প্রভাবিত হবে কীভাবে?

আরও পড়ুন
একটা ব্ল্যাকহোল দেখতে অনেকটা ফানেলের মতো। ফানেলের মুখটা ঘটনা দিগন্ত। আর ফানেলের সরু নলটার শেষ মাথায় হলো সিঙ্গুলারিটির অবস্থান।

এখানেই আসলে রোভেল্লির ক্যারিশমা কাজ করে। বহুদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা বলার চেষ্টা করছেন, কণাদের মতো স্থান-কালও কোয়ান্টায়িত। কোনো বস্তু তখন কোয়ান্টায়িত হয়, যখন সেটা দানাদার হয়। অর্থাৎ একটা নির্দিষ্ট আকারের পর সেই বস্তুকে আর ভাঙা যায় না। কোয়ার্ক, ইলেকট্রনের মতো মূল কণাদের তাই আর ভাঙা যায় না। আবার আলো বা তাপশক্তির মতো তরঙ্গগুলোরও আসলে দানাদার সত্তা রয়েছে। একটা নির্দিষ্ট প্যাকেটের মধ্যে শক্তি কোয়ান্টায়িত হয়ে থাকে। সেই প্যাকেটকে বলে ফোটন।

তেমনি স্থান–কালেরও একটি ক্ষুদ্র দানাদার সত্তা আছে। স্থান–কালকে এর চেয়ে সংকুচিত করা যায় না। আসলে কোনো বস্তুর ব্যাসার্ধ প্ল্যাঙ্ক দৈর্ঘ্যের (1.616×10⁻³⁵ মিটার) চেয়ে ছোট হতে পারে না। তাই হোলের সংকুচিত ভরশক্তির ব্যাসও এর চেয়ে ছোট হবে না। তবে এর চেয়ে বড় হলেও কোয়ান্টাম প্রভাব কাজ করে। যেমন কাজ করে প্ল্যাঙ্ক দৈর্ঘ্যের চেয়ে আকারে বড় ইলেকট্রন কিংবা কোয়ার্কের ক্ষেত্রে। এ ব্যাপারই হোয়াইট হোলকে বাঁচিয়ে দেয় সিঙ্গুলারিটির হাত থেকে।

ব্ল্যাকহোলের ভরশক্তি একটা অসীম ঘনত্বের বিন্দুতে পরিণত হওয়ার আগেই বাউন্স ব্যাক করে সময়ের উল্টো দিকে। আর এই বাউন্স করতে সে কাজে লাগায় কোয়ান্টাম লাফ। কোয়ান্টাম মেকানিকস বলে, কোনো একটা কোয়ান্টাম কণা কিছু অনুমোদিত নির্দিষ্ট শক্তিস্তরে থাকতে পারে। দুটি অনুমোদিত শক্তিস্তরের মাঝে অননুমোদিত অনেক জায়গা থাকে। সেসব জায়গায় কণারা থাকতে পারে না। তাই এক শক্তিস্তর থেকে আরেক শক্তিস্তরে যেতে হলে কণাদের কোয়ান্টাম লাফ দিতে হয়। মাঝের অননুমোদিত জায়গাগুলো এড়িয়ে তারা এক শক্তিস্তর থেকে আরেক শক্তিস্তরে চলে যায়।

আরও পড়ুন
ব্ল্যাকহোলের ভরশক্তি একটা অসীম ঘনত্বের বিন্দুতে পরিণত হওয়ার আগেই বাউন্স ব্যাক করে সময়ের উল্টো দিকে। আর এই বাউন্স করতে সে কাজে লাগায় কোয়ান্টাম লাফ।

ঠিক এভাবেই ব্ল্যাকহোলের ভেতরকার পুঞ্জীভূত কণারা লাফ দিয়ে বাউন্স ব্যাক করতে পারে। তবে সিঙ্গুলারিটির বাইরে তাদের অনুমোদিত জায়গায় বেরিয়ে আসা কঠিন। কিন্তু কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় অসম্ভব বলে কিছু নেই—হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি ও শ্রোডিঙ্গারের ওয়েভ ফাংশন তত্ত্ব থেকে বেরিয়ে আসা কিছু পরিঘটনা সেটা প্রমাণ করে।

কণাদের তরঙ্গ ফাংশন থাকে; অনুমোদিত শক্তিস্তরের বাইরেও তরঙ্গ ফাংশনের বিস্তার থাকার কিছুটা সম্ভাবনা থাকে। ক্ষীণ এই সম্ভাবনাও অনেক সময় বাস্তব হয়ে ওঠে। কণাদের সংখ্যা যখন কোটি কোটি হয়, তখন কিছুসংখ্যক কণা কোয়ান্টাম বাধা টপকে বাইরে চলে যায়। তাই একেবারে নিরেট একটা প্রতিবন্ধক তুললেও সব কণাকে আটকে ফেলা যায় না। টানেলিংয়ের সাহায্যে কিছু কণা ঠিকই বেরিয়ে আসে।

ব্ল্যাকহোলের ভেতরের পুঞ্জীভূত ভরশক্তিও এভাবে বারবার কোয়ান্টাম লাফ দিয়ে কয়েকবার অন্তত সফল হয়। তবে এ ক্ষেত্রে ব্ল্যাকহোলের স্থান–কাল উভয়ই এখানে কণাদের মতো আচরণ করে এবং কোয়ান্টাম লাফ দিয়ে উল্টো দিকে চলে যায়। পরিণত হয় হোয়াইট হোলে।

আরও পড়ুন
কণাদের সংখ্যা যখন কোটি কোটি হয়, তখন কিছুসংখ্যক কণা কোয়ান্টাম বাধা টপকে বাইরে চলে যায়। তাই একেবারে নিরেট একটা প্রতিবন্ধক তুললেও সব কণাকে আটকে ফেলা যায় না।

হোয়াইট হোল কি আদৌ আছে

হকিং বিকিরণের কারণে ব্ল্যাকহোলের ঘটনা দিগন্ত ক্রমেই ছোট হতে থাকে। কিন্তু ঘটনা দিগন্ত ছোট হওয়া মানেই কিন্তু এর ভেতরকার জায়গা কমে যাওয়া নয়। বরং ছোট ঘটনা দিগন্তের ভেতরে বিশাল স্থান–কাল নিয়েই বহাল তবিয়তে থাকে ব্ল্যাকহোল। তারপর সেই বড় স্থান–কাল কোয়ান্টাম লাফ দিয়ে শ্বেত গহ্বরে পরিণত হতে পারে। কিন্তু এত কিছুর পরও তাহলে শ্বেত গহ্বরকে আমরা খুঁজে পাচ্ছি না কেন?

এর মূল কারণ, স্থান-কালের একটা ভুল কনসেপ্ট আমাদের মনে গেঁথে আছে। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়েও আমাদের ধারণা স্পষ্ট নয়। সময় যে উল্টো দিকে প্রবাহিত হতে পারে আমাদের বাস্তব জগতেই, সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান দিয়ে সেটা বোঝা অসম্ভব।

এ বিষয়ে একটা দারুণ উদাহরণ দিয়েছেন কার্লো রোভেল্লি তাঁর ‘হোয়াইট হোলস’ বইয়ে। ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় অতীত ও বর্তমানকে আলাদা করে বোঝার ক্ষমতা নেই আমাদের।

রোভেল্লি একটি পানির ট্যাংকের উদাহরণ দিয়েছেন। বলেছেন, পানির ট্যাংকের মাঝখানটা একটা পানিরোধক ব্ল্যাকহেড দিয়ে আলাদা করা। ব্ল্যাকহেড সরিয়ে দিয়ে ট্যাংকে পানি ঢালুন। ট্যাংকের সব দিকে পানির উচ্চতা সমান। পানি দেখে স্থিতিশীল মনে হবে। এ অবস্থায় ট্যাংকের পানির দিকে ক্যামেরা তাক করে ভিডিও করুন। তারপর সেই ভিডিও রিভার্স মোডে চালু করে দেখুন, স্বাভাবিক মোড আর রিভার্স মোডের মধ্যে কোনো পার্থক্যই পাবেন না।

মহাবিশ্ব যদি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় থাকে, তাহলে সময়ের সামনে চলা আর পেছনে চলার মধ্যে কোনো পার্থক্যই পাবেন না আপনি।

আরও পড়ুন
পানির ট্যাংকের মাঝখানটা একটা পানিরোধক ব্ল্যাকহেড দিয়ে আলাদা করা। ব্ল্যাকহেড সরিয়ে দিয়ে ট্যাংকে পানি ঢালুন। ট্যাংকের সব দিকে পানির উচ্চতা সমান। পানি দেখে স্থিতিশীল মনে হবে।

এবার ব্ল্যাকহেডটা দিয়ে ট্যাংকের দুই পাশ আলাদা করে ফেলুন। পানি ঢালুন ট্যাংকের এক পাশে। আরেক পাশে পুরোপুরি ফাঁকা রাখুন। একদিকে পানির উচ্চতা অনেক বেশি, আরেক দিকে পানি একদম নেই। এবার ব্ল্যাকহেড খুলে দিন। পানি ধীরে ধীরে ট্যাংকের ভরা অঞ্চল থেকে খালি অঞ্চলের দিকে ধাবিত হবে। একসময় পুরো ট্যাংকে পানির স্তর সমান হলে পানির প্রবাহ বন্ধ হবে, ট্যাংক এসে যাবে ভারসাম্যে। ব্ল্যাকহেড খোলার পর পানি ভারসাম্যে আসার আগপর্যন্ত মাঝের সময়টিকে ভিডিও করুন। তারপর স্বাভাবিক ও রিভার্স মোডে চালিয়ে দেখুন, স্পষ্ট পার্থক্য দেখতে পাবেন।

রোভেল্লি বলেছেন, মহাবিশ্ব যখন ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় থাকে, তখন অতীত আর ভবিষ্যতের মধ্যে পার্থক্য করা মুশকিল—ট্যাংকের পানির মতোই। সময়ে বিপরীতমুখী প্রবাহ তাই বোঝা একেবারে অসম্ভব। আমাদের মহাবিশ্ব এখন এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ের মধ্যে যাচ্ছে, যার শুরুটা হয়েছিল বিগ ব্যাংয়ের মাধ্যমে। তাই এখন সময়ের ভবিষ্যৎ আর অতীতের মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। এনট্রপির বেড়ে চলা সময়কে সামনের দিকেই এগিয়ে নিচ্ছে, পেছন দিকে চলতে বাধা দিচ্ছে। কিন্তু কোয়ান্টাম লেভেলে সময় পেছন দিকেও চলতে পারে। কিন্তু সেই জগতে সময়ের ভারসাম্য রয়েছে। তাই অতীত ও ভবিষ্যতের পার্থক্য করা মুশকিল।

কোয়ান্টাম প্রক্রিয়া দ্বারা প্রভাবিত একটা ব্ল্যাকহোল সময়ের পেছন দিকে প্রবাহিত হলেও সেটাকে সাধারণ একটা ব্ল্যাকহোলের সঙ্গে পার্থক্য করা মুশকিল।

আরও পড়ুন
রোভেল্লি বলেছেন, মহাবিশ্ব যখন ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় থাকে, তখন অতীত আর ভবিষ্যতের মধ্যে পার্থক্য করা মুশকিল—ট্যাংকের পানির মতো। সময়ে বিপরীতমুখী প্রবাহ তাই বোঝা একেবারে অসম্ভব।

আরেকটা বড় সমস্যা হলো, সময়ের ধীর হয়ে যাওয়া। কোনো নভোচারী যদি ব্ল্যাকহোলের ঘটনা দিগন্তের দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন, আমরা দেখব তিনি যত এগোচ্ছেন, সময় তত ধীর হচ্ছে। ঘটনা দিগন্তের রেখায় পৌঁছে গেলে সময় অত্যন্ত ধীর হয়ে যাবে। সেখানকার এক সেকেন্ড আমাদের কাছে এক কোটি বছরের সমান হয়ে যাবে। তাই নভোচারীকে তো বটেই, আমাদের কয়েক প্রজন্মও দেখবে নভোচারী ঘটনা দিগন্তের রেখায় গিয়ে জমে গিয়েছেন। তারপর হয়তো এক কোটি বছরের পরের প্রজন্ম দেখবে একজন নভোচারীকে ব্ল্যাকহোলের ঘটনা দিগন্ত পেরিয়ে যেতে।

হোয়াইট হোলের ভেতর থেকে ঘটনা দিগন্ত থেকে বেরিয়ে আসা কোনো বস্তুকে দেখতে হলে কোটি কোটি বছর অপেক্ষা করতে হবে
ছবি: সংগৃহীত

তেমনি হোয়াইট হোলের ঘটনা দিগন্তের কাছেও সময় আমাদের জন্য খুব ধীরে চলবে। তাই হোয়াইট হোলের ভেতর থেকে ঘটনা দিগন্ত থেকে বেরিয়ে আসা কোনো বস্তুকে দেখতে হলে কোটি কোটি বছর অপেক্ষা করতে হবে। ঠিক এ কারণেই আমরা এখন কোনো হোয়াইট হোল যদি শনাক্তও করতে পারি, সেটাকে ব্ল্যাকহোল ভেবে ভুল করার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ।

আরও পড়ুন
কোনো নভোচারী যদি ব্ল্যাকহোলের ঘটনা দিগন্তের দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন, আমরা দেখব তিনি যত এগোচ্ছেন, সময় তত ধীর হচ্ছে। ঘটনা দিগন্তের রেখায় পৌঁছে গেলে সময় অত্যন্ত ধীর হয়ে যাবে।

তাই হোয়াইট হোলের তত্ত্বকে যেমন উড়িয়ে দিতে পারবেন না, তেমনি এটার অস্তিত্ব আছে—এটার প্রমাণও দেওয়া সম্ভব নয়। রোভেল্লি মনে করেন, হোয়াইট হোল নিয়ে তাঁরা যে তত্ত্বটা গড়ে তুলেছেন, সেটা একদম খাঁটি। ব্ল্যাকহোল প্রথম শনাক্ত করার বহু আগেই যেমন এর তাত্ত্বিক ও গাণিতিক কাঠামো ছিল, হোয়াইট হোলের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাদের হাতে তত্ত্ব আছে, সুন্দর গাণিতিক কাঠামো আছে, কিন্তু পরীক্ষামূলক প্রমাণ নেই।

কত দিনে মহাবিশ্বের সবচেয়ে উজ্জ্বল বস্তুটির সন্ধান মিলবে, সে কথা এখনই কেউ জোর দিয়ে বলতে পারেন না।

লেখক: সাংবাদিক

সূত্র: ১. হোয়াইট হোলস: হোয়াট উই নো অ্যাবাউট ব্ল্যাকহোলস নেগলেটেড টুইনস/চার্লি উড/অল অ্যাবাউট স্পেস ১১ জুলাই ২০২৩

২. হোয়াইট হোলস /কার্লো রোভেল্লি/ অনুবাদ: আবুল বাসার

*লেখাটি ২০২৫ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় নভেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত 

সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬

অবসরে দেখতে পারেন সায়েন্স ফিকশন মুভি ইন্টারস্টেলার (Interstellar)...


মুভির নাম: ইন্টারস্টেলার

পরিচালক ও লেখক: ক্রিস্টোফার নোলান

ধরন: থ্রিলার, ড্রামা, অ্যাডভেঞ্চার 

প্রকাশকাল: ২০১৪

ব্যাপ্তি: ২ ঘণ্টা ৪৯ মিনিট

আইএমডিবি রেটিং: ৮.৭

পুরস্কার: সেরা ভিজ্যুয়াল এফেক্টের জন্য অস্কার


ক্রিস্টোফার নোলানের ইন্টারস্টেলার কেবল সাধারণ বিজ্ঞান কল্পকাহিনী মুভি নয়, এটা একটা মাস্টারপিস। ছবিটির গল্প শুরু হয় এমন এক পৃথিবীতে, যেখানে প্রবল ধূলিঝড় ও খাদ্যের অভাব। মানবজাতিকে বাঁচানোর শেষ আশা হিসেবে কুপার নামে এক প্রাক্তন পাইলট বাধ্য হয়ে বেরিয়ে পড়েন মহাকাশ অভিযানে। তাঁর মূল লক্ষ্য শনি গ্রহের কাছে খুঁজে পাওয়া একটি ওয়ার্মহোলের (Wormhole) মধ্য দিয়ে ছুটে যাওয়া মহাবিশ্বের অন্য কোনো প্রান্তে, খুঁজে বের করা নতুন কোনো বাসযোগ্য গ্রহ। মুভিতে টাইম ডাইলেশন, ব্ল্যাকহোলের মতো জটিল ও আকর্ষণীয় বৈজ্ঞানিক অনেক বিষয় দেখা যাবে। শেষ পর্যন্ত কুপার কি খুঁজে পায় নতুন কোনো গ্রহ? কী আছে ওয়ার্মহোলের ওপারে? জানতে দেখতে হবে মুভিটি।


ইন্টারস্টেলার মুভিটি অনেকেই দেখেছেন। অত্যন্ত উপভোগ্য সায়েন্স ফিকশন মুভি। মুভিটির প্লট নিয়ে আলোচনা করে স্পয়লার দেওয়া ঠিক হবে না, যদিও যথেষ্ট পুরোনো হয়েছে মুভিটি। তবে মোটাদাগে বলা যায়, অনতিদূর ভবিষ্যতের ছবি আঁকা হয়েছে মুভিটিতে। তখন পৃথিবী পরিবেশ বিপর্যয়ের কবলে। তখনকার মানুষ স্পেস ট্রাভেলে সক্ষম, কিন্তু ঘরের অবস্থা সঙিন বলে স্পেস মিশনগুলো আপাতত নিষ্প্রভ। এমতাবস্থায় ঘটনাচক্রে মুভিটিতে ওয়র্মহোল দিয়ে ভ্রমণ, দানবাকৃতির কৃষ্ণবিবর দর্শন, বিচিত্র বাহ্যগ্রহ বা এক্সোপ্লানেটে ভ্রমণ, দানবাকৃতির কৃষ্ণবিবরের ঘটনাদিগন্তের সীমানায় নায়কের পঞ্চমমাত্রা লাভ, স্পেসটাইমের রহস্যকে কাছ থেকে দেখা, গ্র্যাভিটির কারুকাজ ইত্যাদি মুভিটির আকর্ষণীয় বিষয়।


আসলে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক ধারণার ভিত্তিতে বানানো হয়েছে এ মুভি। কিন্তু কেমন সেই ভিত্তি? কীভাবেই-বা ওয়র্মহোল বা গার্গাঞ্চুয়ার মতো ব্ল্যাকহোল তৈরি হতে পারে, তার আশপাশে স্থান-কালের বক্রতা কেমন রূপ গ্রহণ করে? আর সেই চরম স্পেসটাইমে আমরা আর কী কী ভৌত প্রপঞ্চ আশা করতে পারি? এমন মহাজাগতিক পরিস্থিতিতে কী রকম গ্রহ থাকতে পারে, সেসব গ্রহের আশ্চর্য ঘটনার দু-একটি এই মুভিতে দেখানো হয়েছে।


মুভিটি ক্যালটেকের বিখ্যাত পদার্থবিদ কিপ থর্নের বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, কিংবা বলা যায় যাঁর সার্বক্ষণিক বুদ্ধি-পরামর্শ নেওয়া হয়েছে। মহাকর্ষবিষয়ক একজন জগত্খ্যাত বিশেষজ্ঞ উনি। তাঁর আগের বই ব্ল্যাকহোলস অ্যান্ড টাইম ওয়ার্পসও বিখ্যাত। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান গ্রাভিটেশন নামের ঢাউস বইটি। কেউ যদি মহাকর্ষ শিখতে চায়, তাহলে এই বই পড়তেই হবে। আন্ডারগ্র্যাড থেকে পিএইচডি পর্যন্ত মহাকর্ষ বিষয়ে নানা পর্যায়ের খুঁটিনাটি বিজ্ঞান এই বইয়ে আছে। কিপ বহুদিন ধরে এক্সাক্ট সায়েন্সের ভিত্তিতে একটি মুভি বানানোর চিন্তা করছিলেন। এর আগে কার্ল সাগানের বিখ্যাত সায়েন্স ফিকশন কনট্যাক্ট লেখার সময় ‘সময় ভ্রমণ’-এর ব্যাপারে তাঁর পরামর্শ চান। তিনি প্রায় ১৬ পাতার সমীকরণ কষে এমন এক সমাধান দিয়েছিলেন যে সাগানকে সেই গল্প নতুন করে লিখতে হয়েছিল। পরে সে গল্প নিয়ে মুভিও হয়েছে। অতএব এসব চিন্তাবীজ আগে থেকেই তাঁর মাথায় ছিল-প্রায় কুড়ি বছর ধরে তাঁর চিন্তার ফসল ইন্টারস্টেলার মুভি। এ মুভিতে পাঁচ মাত্রার কথা, ব্ল্যাকহোলের কোল ঘেঁষে টেসারেক্টের কল্পনার কথা, পাঁচ মাত্রিক সত্তা বাল্ক-বিয়িংয়ের কথা, টাইম ট্রাভেলের কথা, ওয়ার্মহোলের কথা, কক্ষপথের স্ট্যাবিলিটির কথা, ব্রেন বিশ্বের কথা, কম্পিউটার গ্রাফিকসের কথা, আইনস্টাইনের সমীকরণের বিবিধ সমাধানের কথা, জোয়ার বলের কথা। এসব বৈজ্ঞানিক চিন্তার বাস্তব সম্ভাবনা কী? কিপ থর্নের মতে, বাস্তব সম্ভাবনা এক জিনিস আর তাত্ত্বিক সম্ভাবনা আরেক জিনিস। এই মুভিতে সেব ভৌত প্রপঞ্চ দেখানো হয়েছে এর সবই পদার্থবিজ্ঞানের কোনো না কোনো তত্ত্বের আলোকে সম্ভব, অন্তত তাত্ত্বিকভাবে। তবে বাস্তব হলো সব তত্ত্বের রূঢ় পরীক্ষক। বাস্তবে মিলল তো টিকে গেল, নইলে বাতিল। এই হলো ব্যাপার।


প্রথমে আসা যাক গারগাঞ্চুয়া নামের যে বিশাল ব্ল্যাকহোলটি এখানে দেখানো হয়েছে তার সম্ভাবনা যাচাইয়ে। সৌরভরের মিলিয়ন গুণ কৃষ্ণবিবর প্রতিটি গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকে, এ কথা জ্যোতিঃপদার্থবিদেরা নিশ্চিত করেছেন। আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্রে আছে একটি ৪ মিলিয়ন সৌরভরের দানবীয় ব্ল্যাকহোল, সূর্য থেকে প্রায় ২৭ হাজার আলোকবর্ষ দূরে ধনু রাশির দিকে।


একে আকাশে স্যাজিটারিয়াস এ* বলে চিহ্নিত করা হয়। ‘স্টার’ চিহ্নিত কেননা এটি তুমুল এক্সরশ্মির বিকিরণ দেখায়। এ ছাড়া এটি প্রবল রেডিও তরঙ্গের উত্সও বটে। এ ধরনের ব্ল্যাকহোল সৃষ্টি হয় গ্যালাক্সি সৃষ্টির সময় থেকেই ঘনীভূত গ্যাসপিণ্ডের মহাকর্ষীয় পতন থেকে। অন্যদিকে সূর্যের তুলনায় ২০-৩০ গুণ ভরের নক্ষত্র যখন আয়ুষ্কালের শেষস্তরে পৌঁছায়, তখন সে সুপারনোভা বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে ব্ল্যাকহোলে পরিণত হয়। এরা সুপারম্যাসিভ বা দানবীয় ব্ল্যাকহোল থেকে ভিন্ন, তবে ব্ল্যাকহোলের মৌলিক ধর্মাবলি সবারই একই রকম। কেবল অতি দানবীয় ভরের ব্ল্যাকহোলের আশপাশে মহাকর্ষীয় প্রপঞ্চ নাটকীয় গুণে বেশি হবে, এই যা। ফলে গারগাঞ্চুয়ার মতো অতিদানব কৃষ্ণবিবরের কাছে স্থানকালের বঙ্কিমতা এত বেশি হবে যে সেখানে নানা চরম ঘটনা, যাদের কেবল তাত্ত্বিক সম্ভাবনা রয়েছে, মূর্ত হয়ে দেখা দিতে পারে। যেমন টেসারেক্টের ঘটনা। টেসারেক্ট হলো ঘনকের ভেতর ঘনক। অর্থাত্ এমন এক কাঠামো যেটা চতুর্মাত্রিক ঘনক বোঝায়। একটি বর্গক্ষেত্রের একমাত্রিক প্রতিচ্ছায়া যদি নেওয়া যায়, সেটা তবে একটি রেখা হবে, দুই মাত্রায় একটি ঘনকের প্রতিরূপ হবে বর্গাকৃতির। এই জ্যামিতিক যুক্তিতে ধারণা করা যায় যে একটি চতুর্মাত্রিক ঘনকের ত্রিমাত্রিক ছায়া হবে ঘনকের ভেতর ঘনক। এটি কোনো কল্পনার ব্যাপার নয়, এটি একটি জ্যামিতিক প্রতিভাস।


চার মাত্রার কঠিন বস্তু আমরা কল্পনা করতে পারি না। কারণ, আমরা তিন মাত্রায় অভ্যস্ত চতুর্মাত্রিক জীব, তাই টেসারেক্টের গঠন কল্পনা করতে অসুবিধা হয়। এ নিয়ে অবশ্য কার্ল সাগানের একটি চমত্কার ভিডিও আছে (ইউটিউব দেখতে পারেন: Flatland & the 4th Dimension - Carl Sagan)। কাজেই টেসারেক্টের যে কল্পনা এই মুভিতে দেখানো হয়েছে সেটা খুবই সম্ভব, বিশেষ করে দানবাকৃতির কৃষ্ণবিবরের ঘটনা দিগন্তের ধারে স্থানকাল যেভাবে দুমড়ে-মুচড়ে যায় সেখানে। একে কীভাবে দেখাবে সেই অংশটা কাল্পনিক, কিন্তু টেসারেক্টের বৈজ্ঞানিক সম্ভাব্যতা অপরিহার্য।


এই মুভিতে দানবাকৃতির ব্ল্যাকহোলটিকে যেভাবে দেখানো হয়েছে, সেটা সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক। যেকোনো ব্ল্যাকহোল আশপাশ থেকে পদার্থ টেনে নেয়। ফলে এর পাশে পদার্থের একটি ঘুরন্ত ডিস্ক তৈরি হয়, একে বলে অ্যাক্রেশন ডিস্ক। দানবাকৃতির ব্ল্যাকহোলের পাশে এই ডিস্কটি আরও নাটকীয়ভাবে দেখা যাবে। একে কেমন দেখা যাবে সেটা নিয়ে কিপ থর্নসহ অন্য বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের গবেষণা আছে। মূলত কম্পিউটার সিমুলেশনভিত্তিক এই গণনায় ব্ল্যাকহোলের চারপাশের এই ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে আসা অ্যাক্রেশন ডিস্কটি অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে দেখা দেবে। ব্ল্যাকহোল যেহেতু আলো শুষে নেয়, তাই এতে দেখার কিছু নেই, কিন্তু ওই ডিস্কটি একটি চোখ ধাঁধানো দৃশ্যের অবতারণা করবে। ইন্টারস্টেলার মুভিতে যেভাবে দেখানো হয়েছে তার আরেকটু জটিল ব্যাখ্যা আছে। ব্ল্যাকহোলের সামনের দিকে যে ডিস্ক থাকবে তাকে তো দেখাই যাবে, কিন্তু সেটি ঘুরে যখন পেছনে যাবে তখন তাকেও দেখা যাবে এই কারণে যে ব্ল্যাকহোল তার পেছনের আলোকে বাঁকিয়ে দেয়। এ জন্য মুভিতে অ্যাক্রেশন ডিস্ককে ধনুকের মতো দেখায়।


মুভিতে আরেকটা জিনিস দেখায় (আরও অনেক জিনিস দেখায়, কিন্তু সব তো এই ছোট প্রবন্ধে শেষ করা যায় না) মিলারের গ্রহ নামের একটি সম্পূূর্ণ জলমগ্ন গ্রহ। সম্পূর্ণ জলমগ্ন গ্রহ কি সম্ভব?


এক্সোপ্লানেট বা বাহ্যগ্রহ নিয়ে কেপলার মিশনের মাধ্যমে আমরা অনেক কিছু জেনেছি। যেমন হেন রকম ঘটনা নেই, যা বহুবিচিত্র বাহ্যগ্রহে ঘটে না। জ্যোতির্বিদ কালেব শার্ফ বলেন, ‘এখন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সম্ভাব্য গ্রহগত গঠন ও পরিবেশের এক বিচিত্র রংধনু সমাবেশ খুঁজে পেয়েছেন। খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে এমন সব গ্রহ, যাদের বাতাবরণে আছে জলীয় বাষ্প কিংবা আণবিক হাইড্রোজেন, মহাসামুদ্রিক গ্রহ, যাদের কোনো ডাঙাই নেই (শুধুই জলরাশি), কার্বনগ্রহ এবং তাদের বিচিত্র গ্রহবিজ্ঞান, এবং চিরস্থায়ী শৈত্যে আক্রান্ত তুষারিত ধরিত্রী যাদের বায়ুমণ্ডল পর্যন্ত জমে ভূপৃষ্ঠে পতিত হয়েছে। আছে অতি উত্তপ্ত, অতিশীতল, উষ্ণ কিংবা সামান্য গরম গ্রহ কিংবা এমন গ্রহ, যার মধ্যে এর সবগুলোই দেখা যায়। আছে রসায়নে সমৃদ্ধ গ্রহ, যাদের মধ্যে থাকবে অজানা যৌগের সমুদ্র, অনেকেই থাকবে পৃথিবীর মতোই। এমনকি রসায়নে দুর্বল গ্রহও থাকবে। শনির মতো ধুলা কিংবা বরফের বলয় যুক্ত গ্রহও থাকবে। অনেক গ্রহের উপগ্রহ থাকবে, কারও কারও উপগ্রহ হয়তো পৃথিবী বা মঙ্গলের মতোই বড় হবে, যাদের নিজস্ব বায়ুমণ্ডল, মহাসমুদ্র ও স্থলভাগ থাকবে।’ কাজেই সম্পূর্ণ জলমগ্ন গ্রহের সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। জল না হয়ে সেখানে তরল অ্যামোনিয়া বা মিথেনের সাগর থাকতে পারে। শনির উপগ্রহ টাইটানেই তো মিথেনের হ্রদ আছে।


কাজেই মিলারের গ্রহ সম্পূর্ণ জলমগ্ন হতে বাধা নেই। আর সেখানে ১.২ কিলোমিটার উঁচু ঢেউ কীভাবে সম্ভব? সেটা সম্ভব গারগাঞ্চুয়ার প্রবল জোয়ার বলের কারণে। যখন কোনো ছোট বস্তু একটি বৃহত্ বস্তুর মহাকর্ষীয় প্রভাবের মধ্যে তখন একে ওপরের ওপর জোয়ার বল বা টাইডাল ফোর্স প্রয়োগ করে। এর উত্পত্তি হয় মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের ডিফারেন্সিয়াল প্রয়োগের কারণে। চাঁদ পৃথিবীর ওপর, পৃথিবী চাঁদের ওপর, বৃহস্পতি গ্রহ তার উপগ্রহদের ওপর জোয়ার বল প্রয়োগ করে। কাজেই মিলারের গ্রহের ওপরও জোয়ার বল কাজ করবে। তার ফলেই প্রবল জোয়ারের টানে পাহাড়প্রমাণ ঢেউ ছুটে আসে।


মুভিতে দেখানো পঞ্চমাত্রিক বাল্ক-বিয়িং কি সত্য, যারা টেসারেক্ট তৈরি করে ক্যাপ্টেন কুপারকে তাঁর মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটিয়ে দিয়েছিল? চার মাত্রার অতিরিক্ত আরও মাত্রা আছে কি না সেটা একান্তই কল্পনার ব্যাপার। স্ট্রিং থিওরি ও মাল্টিভার্সের তত্ত্বমতে, একাধিক মাত্রা সম্ভব, কিন্তু তাদের কোনো পরীক্ষণলব্ধ প্রমাণ নেই। চার মাত্রার তুলনায় পাঁচ বা ততোধিক মাত্রায় পদার্থবিজ্ঞান অনেক বেশি কৌতূহলোদ্দীপক হয়, অনেক ইন্টারেস্টিং ফিজিকসের দেখা মিলে। কাজেই তিনের বেশি মাত্রা হতেই পারে। তবে যতক্ষণ না তথ্যপ্রমাণ মিলছে ততক্ষণ বাল্ক-বিয়িংয়ের ধারণা কল্পনাতেই থাকুক।


মুভির একদম শেষে দেখা যায়, কুপারকে উদ্ধার করে এক স্পেসশিপে রাখা হয়েছে। স্পেসশিপটি একটি বহু প্রজন্মের স্টারশিপ, যাতে বহু হাজার লোক থাকতে পারে, সেখানে কৃত্রিম গ্র্যাভিটির ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমার কাছে মনে হয়েছে মানুষের ভবিষ্যতের স্পেসমিশনের লক্ষ্যে এটা একটা শক্তিশালী বার্তা যেটা ক্রিস্টফার নোলানের চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং অসাধারণ স্ক্রিপ্টের গুণে ভীষণ জীবন্ত হয়ে উঠেছে।


লেখক: ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী

অধ্যাপক, তড়িেকৗশল ও ইলেকট্রনিকস বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়


সূত্র: প্রফেসর কিপ থর্ন, দ্য সায়েন্স অব দ্য ইন্টারস্টেলার, ২০১৪


*লেখাটি ২০১৭ সালে বিজ্ঞানচিন্তার জুলাই সংখ্যায় প্রকাশিত

হোয়াইট হোল কি সত্যিই আছে

হোয়াইট হোল কি সত্যিই আছে বর্তমানে ব্ল্যাকহোলের মতোই বহুল আলোচিত মহাজাগতিক বস্তু হোয়াইট হোলস। কিন্তু ব্ল্যাকহোলের পরীক্ষামূলক প্রমাণ থাকলেও ...